বিচারহীনতায় বেপরোয়া ইন্টার্ন চিকিৎসকরা
আধুনিক রিপোর্ট:
সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিভাগের অন্যতম প্রধান সরকারি চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান। উন্নত চিকিৎসার আশায় প্রতিদিন এখানে আসেন সিলেটসহ আশপাশের জেলার অসংখ্য মানুষ। কিন্তু চিকিৎসা নিতে এসে রোগীর স্বজনদের হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন সাংবাদিকেরাও। কখনো মারধর, কখনো লাঞ্ছনা, আবার কখনো অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষানবিশ (ইন্টার্ন) চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে।
এসব ঘটনায় বিভিন্ন সময় তদন্ত কমিটি গঠন, মামলা ও ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দৃশ্যমান নজির নেই। উল্টো বিভিন্ন ঘটনার পর চিকিৎসাসেবা বন্ধ রেখে কর্মবিরতি পালন করেছেন শিক্ষানবিশ চিকিৎসকেরা। এমনকি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগও রয়েছে।
গত এক দশকে হাসপাতালটিতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা পর্যালোচনায় এমন চিত্র পাওয়া গেছে। সর্বশেষ গত ২৮ অক্টোবর রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার ঘটনা ধারণ করতে গিয়ে আক্রান্ত হন দুই সাংবাদিক। এর প্রতিবাদে ৩১ অক্টোবর মানববন্ধন করে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান সাংবাদিকেরা।
সাংবাদিকরাও নিরাপদ নন
গত ২৮ অক্টোবর হাসপাতালের ভেতরে রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার ঘটনা ধারণ করতে গিয়ে আহত হন দৈনিক শ্যামল সিলেটের ফটোসাংবাদিক রেজা রুবেল ও সিলেটভিউ২৪ডটকমের স্টাফ রিপোর্টার নিবেন্দু তালুকদার। তাঁদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনার প্রতিবাদে ৩১ অক্টোবর সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করেন বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের সদস্যরা। তাঁদের অভিযোগ, পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও হাসপাতালে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে সাংবাদিকদের। ঘটনার পর শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা কর্মবিরতি ও শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন। এতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়। হামলার অভিযোগের বিচার দাবির মধ্যে চিকিৎসাসেবা বন্ধ রাখার কর্মসূচি হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সংঘর্ষের পর কর্মবিরতি
চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি হাসপাতালের চতুর্থ তলার সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত পাঁচজন আহত হন। এক নারী শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে হেনস্তার অভিযোগও ওঠে। চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে রোগীর স্বজনেরা কথা-কাটাকাটিতে জড়ালে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরে রোগীর তিন স্বজনকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এ ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেন শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা। একই বছরের ৮ জুলাই হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের কয়েক দফা সংঘর্ষ হয়। এরপর অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেওয়া হয়। ইন্টার্ন ডক্টরস ফোরাম রোগীর স্বজনদের বিরুদ্ধে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে তাঁদের শাস্তি দাবি করে।
২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে এক রোগীর স্বজনকে চিকিৎসকের লাথি মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অভিযুক্ত চিকিৎসক তন্ময় দেবনাথকে দায়িত্ব পালন থেকে বিরত রেখে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তবে তদন্তের ফলাফল ও পরবর্তী ব্যবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ২০২৪ সালের ২১ মার্চ এক প্রবীণ রোগীকে চিকিৎসকরা মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় এক নারী চিকিৎসক হাসপাতালের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। ওই ঘটনার তদন্ত ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও স্পষ্ট নয়।
রোগীর মৃত্যু ঘিরে সংঘর্ষ
২০২৩ সালের ২১ আগস্ট হাসপাতালের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের সঙ্গে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের সংঘর্ষ হয়। হাসপাতালের ভেতরে ভাঙচুরের অভিযোগও ওঠে। পরে রোগীর চার স্বজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ ছিল, যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, তাঁদের বিরুদ্ধে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। তবে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ, রোগীর মৃত্যুর কারণ এবং সংঘর্ষে জড়িত ব্যক্তিদের দায় নির্ধারণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়।
২০২২ সালের ৩ আগস্ট শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হামলার অভিযোগে কর্মবিরতি পালন করা হয়। একই সঙ্গে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়ার কর্মসূচিও পালিত হয়। হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়াকে তাঁর কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ ওঠে। পরে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হানিফের করা মামলায় আবদুল্লাহ নামের এক যুবকসহ অজ্ঞাতনামা তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়। ওই বছরের ১২ আগস্ট হাসপাতালের চতুর্থ তলার ১ নম্বর ওয়ার্ডে রোগীর স্বজন রুবেনা বেগম (২৭) মারধরের শিকার হন বলে অভিযোগ ওঠে।
পুরনো ঘটনাও বিচারের বাইরে
২০২১ সালের নভেম্বরে এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিককে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ ওঠে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। অসুস্থ শ্বশুরকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা শুরুতে বিলম্বের অভিযোগ জানাতে গিয়ে তিনি তাঁদের রোষানলে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে অন্য সাংবাদিকেরা হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করেন। ২০১৯ সালের ১২ মার্চ হাসপাতালের অভ্যর্থনা কক্ষে বিশৃঙ্খলার অভিযোগে রোগীর দুই স্বজনকে মারধর করা হয়। পরে তাঁদের প্রকাশ্যে কান ধরিয়ে ওঠবস করানোর অভিযোগ ওঠে। আহত ব্যক্তিরা যাতে অভিযোগ করতে না পারেন, সে জন্য তাঁদের কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগও ছিল। এর আগের বছরের ৪ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তাকর্মীদের টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বচসা ও হামলায় রোগীর দুই স্বজন আহত হন বলে অভিযোগ ওঠে।
২০০৮ সালেও হাসপাতালটিতে কয়েকজন ফটোসাংবাদিকের ওপর শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের হামলার অভিযোগ উঠেছিল। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষানবিশ চিকিৎসকেরা দুঃখ প্রকাশ করেন এবং আপসের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেন বলে জানা যায়। এরপরও বিভিন্ন সময়ে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
তদন্ত কমিটি হলেও শাস্তি নজির নেই
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সংঘর্ষ, মারধর ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কোনো ঘটনায় চিকিৎসককে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে, কোনো ঘটনায় মামলা হয়েছে। কিন্তু তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল, সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য পাওয়া যায় না। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবু জাফর মো. খালেদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. বদরুল আমিন বলেন, পরিচালক স্যার ছুটিতে আছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার এখতিয়ার আমার নেই।


