স্পোর্টস ডেস্ক ::
ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ঠেকানোই তার কাজ। তবে মাঠের বাইরেও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন হামজা চৌধুরী। সেই বিশ্বাস থেকেই যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজার শিশুদের পাশে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই ফুটবলার। তার উদ্যোগে আয়োজিত এক দাতব্য অনুষ্ঠান থেকে সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। শুধু অর্থ সংগ্রহ করেই থেমে থাকেননি হামজা। গাজার মানুষের দুর্ভোগ নিয়ে সবাইকে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, নীরব থাকলে শেষ পর্যন্ত নিপীড়নকারীরাই জিতে যায়। সম্প্রতি আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গাজার শিশুদের পাশে দাঁড়ানোর কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ইংলিশ ক্লাব শেফিল্ড ইউনাইটেডে খেলা এই বাংলাদেশি মিডফিল্ডার। পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা থাকলে তা ভালো কাজেও ব্যবহার করা উচিত জানিয়ে হামজা বলেন, ‘নীরবতা আসলে নিপীড়নকে আরও শক্তিশালী করে। আমরা চুপ থাকলে নিপীড়নকারীরাই জিতে যায়। আমরা চাই বা না চাই, মানুষ আমাদের আদর্শ হিসেবে দেখে। তাই ভালো কোনো উদ্দেশ্যে নিজের কণ্ঠকে কাজে লাগানো আমাদের দায়িত্ব।’ সেই দায়িত্ববোধ থেকেই গাজার শিশুদের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন হামজা। গত রোববার লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলে টাওয়ার হ্যামলেটস টাউন হলে অনুষ্ঠিত হয় দাতব্য অনুষ্ঠানটি। ব্রিটেনে মুসলিম ক্রীড়াবিদদের নিয়ে কাজ করা সংস্থা নুজুম স্পোর্টসের সহযোগিতায় আয়োজন করা হয় অনুষ্ঠান।
সেখানে ফুটবলার ও বিভিন্ন ক্রীড়াব্যক্তিত্বের অংশগ্রহণের পাশাপাশি নিলামে তোলা হয় জার্সি, পদকসহ খেলাধুলার নানা স্মারক। নিজের ক্যারিয়ারের দুটি স্মারকও নিলামে দিয়েছেন হামজা। ২০২১ সালে লেস্টার সিটির হয়ে এফএ কাপ জয়ের সময় পরা তার জার্সিটি বিক্রি হয়েছে ৭ হাজার পাউন্ডে। আর কমিউনিটি শিল্ড জয়ের পদকটি বিক্রি হয়েছে ৩ হাজার পাউন্ডে। অনুষ্ঠান ও পরবর্তী অনুদান মিলিয়ে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ১ লাখ পাউন্ড। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এই অর্থ দেওয়া হবে ‘চিলড্রেন নট নাম্বারস’ নামের একটি দাতব্য সংস্থাকে। গাজায় চিকিৎসার প্রয়োজন এমন শিশুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে কাজ করে সংস্থাটি।
আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হামজা বলেন, ‘একজন মুসলিম হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে আমি মনে করি, চুপ করে বসে থাকতে পারি না। যতটা সম্ভব সাহায্য করা আমার দায়িত্ব। আমি মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে পারি, অর্থ সংগ্রহ করতে পারি। শেষ পর্যন্ত সেই অর্থ গাজায় দুর্ভোগের মধ্যে থাকা শিশুদের সাহায্য করতে কাজে লাগবে।’
অবশ্য গাজার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই মানসিকতা নতুন নয় হামজার। ছোটবেলা থেকেই পরিবার তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে শিখিয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি, ‘আমার পরিবারের বিশ্বাস ও ন্যায়বোধ খুব দৃঢ়। ছোটবেলা থেকেই তাঁরা আমাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শিখিয়েছেন। সেটা খেলার মাঠের কোনো ঘটনা হোক কিংবা গাজার মতো পরিস্থিতি, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন থেকেই পরিবার আমাকে এসব বিষয়ে জানাত। সেই শিক্ষা আমার মধ্যে রয়ে গেছে।’
ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতি প্রকাশের কারণে আগেও আলোচনায় এসেছিলেন হামজা। ২০২১ সালে লেস্টার সিটির হয়ে এফএ কাপ জয়ের পর সতীর্থ ওয়েসলি ফোফানার সঙ্গে ফিলিস্তিনের পতাকা হাতে মাঠে উদ্যাপন করেছিলেন তিনি। পাঁচ বছর পর এবার সরাসরি গাজার শিশুদের চিকিৎসার জন্য অর্থ সংগ্রহে নামলেন বাংলাদেশি এই ফুটবলার। গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে অর্থ সংগ্রহে সহায়তা করা সবাইকে ধন্যবাদ জানান হামজা। তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা গাজার শিশুদের জন্য এক লাখ পাউন্ডের বেশি অর্থ সংগ্রহ করতে পেরেছি।’
নুজুম স্পোর্টসের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে হামজা জানান, সংগঠনটির সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই তার পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। তবে সংগৃহীত অর্থকে গাজার মানুষের দুর্ভোগের তুলনায় সামান্য সহায়তা বলেই মনে করেন তিনি, ‘এখনও অনেক কিছু করার বাকি। তবে যত ছোটই হোক, প্রতিটি প্রচেষ্টাই পরিবর্তন আনতে পারে।’


