শাবিপ্রবি প্রতিনিধি :
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) নীতিমালা লঙ্ঘন করে ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক’ থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ তুলেছেন বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি (বিএমবি) বিভাগের শিক্ষার্থী ও একই বিভাগের বর্তমান প্রভাষক সানজিদা আক্তার। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এবং ২০২১ সালে ‘স্কুল অব লাইফ সায়েন্সেস অনুষদে প্রথম হিসেবে ইউজিসি মেধাবৃত্তি পেয়েছিলেন।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) বিকেলে শাবি প্রেসক্লাব কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ জানান।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সানজিদা আক্তার বলেন, “২০২০ সালে আমি ৩.৯২ সিজিপিএ নিয়ে স্নাতক পাস করি। ২০২২ সালে স্বর্ণপদকের জন্য বিভাগ থেকে আমাকে মনোনয়ন দিয়ে ডিন অফিসে চিঠি পাঠানো হয়। ফলে আমি জানতাম আমার মনোনয়ন ইউজিসিতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু ১৮ জুন ইউজিসি থেকে প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক প্রার্থী পুনঃযাচাই-সংক্রান্ত একটি চিঠি আসে, যেখানে আমার পরিবর্তে একই সিজিপিএ পাপ্ত অন্য প্রার্থীর নাম ও একটি নম্বর দেখতে পাই।”
ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মোছা. আরজুনা আক্তারের মাধ্যমে জানতে পারি ২০২৫ সালে সাবেক উপ-উপাচার্যের নেতৃত্বে একটি সভায় আমাদের দুজনের বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছিল। সেখানে দুজনের সিজিপিএ সমান এবং প্রকৃত প্রাপ্ত নম্বর পাওয়া যাচ্ছিল না বলে একটি গাণিতিক ফ্যাক্টর ব্যবহার করে নম্বর নির্ধারণ করা হয়। আমার পূর্ববর্তী মনোনয়ন সম্পর্কে তিনি অবগত ছিলেন না বলে সভায় বিষয়টি উল্লেখ করেননি।”
প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক নীতিমালা-২০২৫ এর ৮(ঙ) ধারা অনুযায়ী, কোনো অনুষদে স্নাতক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সিজিপিএ প্রাপ্ত একাধিক শিক্ষার্থী থাকলে, তাদের মধ্য হতে সর্বাধিক নম্বরপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে মনোনয়ন প্রদান করতে হবে। একাধিক শিক্ষার্থী সমান নম্বর প্রাপ্ত হলে পর্যায়ক্রমে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি/সমমান) এবং মাধ্যমিক (এসএসসি/সমমান) পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে মনোনয়ন প্রদান করতে হবে। নীতিমালায় কোন গাণিতিক ‘ফ্যাক্টর’-এর কথা বলা হয়নি।
পরবর্তীতে সানজিদা আক্তার বিভাগীয় প্রধানের নির্দেশনায় দুজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে বিভাগের সংরক্ষিত রেকর্ড থেকে ২০১৫-১৬ সেশনের নম্বর যাচাই করেন। এতে মোট ৬৩টি কোর্সের মধ্যে ৪৫টি কোর্সের প্রকৃত নম্বর পাওয়া যায় এবং এই ৪৫টি কোর্সের হিসাবে সানজিদা অন্য প্রার্থীর চেয়ে ৪০.২৫ নম্বরে এগিয়ে থাকেন।
সানজিদা আক্তার বলেন, “বিষয়টি বিভাগীয় প্রধানের মাধ্যমে ডিন মহোদয়কে জানালে তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট ফ্যাক্টর দিয়ে নম্বর নির্ধারণ করায় অন্য প্রার্থীর নম্বর বেশি হয়েছে। কিন্তু যেখানে ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা, সেখানে কোন নীতিমালার ভিত্তিতে একটি অনুমাননির্ভর গাণিতিক ফ্যাক্টর ব্যবহার করা হলো? আর প্রকৃত নম্বর পাওয়া না গেলে কেন বিষয়টি ইউজিসিকে জানানো হয়নি?”
তিনি আরও জানান, এরপর তিনি ডিন অফিস, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর, রেজিস্ট্রার দপ্তর এবং উপাচার্য মহোদয়ের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ ও লিখিত আবেদন করেন। ইউজিসির একজন কর্মকর্তার সঙ্গেও আলোচনা করেন, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের নম্বর সংরক্ষিত না থাকার বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তবে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কোর্সগুলোর নম্বর তাঁদের কাছে সংরক্ষিত নেই বলে জানানো হয়। উপাচার্য বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিলেও কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান মেলেনি।
সানজিদা ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশ্ন তোলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নম্বর সংরক্ষিত না থাকার কারণে আমি কেন আমার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হব?”
পুনঃযাচাইয়ের সময়সীমা নিয়ে তিনি জানান, ২৬ জুন পুনঃযাচাইয়ের কাগজপত্র পাঠানোর শেষ সময়সীমা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কাগজপত্র পাঠানো হয়নি। পরবর্তীতে অন্য প্রার্থীর কাগজপত্র পাঠানো হলেও তাঁর কাগজপত্র পাঠানো হয়েছে কি না, সে বিষয়ে ডিন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও রেজিস্ট্রার দপ্তরে যোগাযোগ করেও স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। শেষ পর্যন্ত রেজিস্ট্রার ভবনের এক কর্মকর্তার মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, ইউজিসিতে অন্য প্রার্থীর নামই পাঠানো হয়েছে।
পুনরায় উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি জানতে পারেন, দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল এবং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। তবে কমিটি কোন নীতিমালার ভিত্তিতে, কীভাবে এবং কোন তথ্যের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলেনি। পরবর্তীতে অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার কালাম আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে বিভাগীয় প্রধানকে নিয়ে সাক্ষাৎ করা হলে তিনি জানান, সভাটি তিনি শুধু সমন্বয় করেছেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে তিনি অবগত নন। এরপর শিক্ষক সমিতি, বিভিন্ন ডিন এবং উপাচার্য দপ্তরেও যোগাযোগ ও লিখিত আবেদন করেও সন্তোষজনক সমাধান পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ ৫ অক্টোবর ইউজিসি প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদকপ্রাপ্তদের তালিকায় অন্য প্রার্থীর নাম দেখতে পান সানজিদা। তিনি বলেন, “আমাদের সিজিপিএ সমান এবং বিভাগের সংরক্ষিত ৪৫টি কোর্সের প্রকৃত নম্বরের হিসাবে আমি তাঁর চেয়ে ৪০.২৫ নম্বরে এগিয়ে রয়েছি। আমার পূর্ববর্তী আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন কীভাবে পরিবর্তিত হলো, কোন নীতিমালার ভিত্তিতে অন্য প্রার্থীর নাম পাঠানো হলো এবং আমার প্রাপ্ত নম্বর কেন যথাযথভাবে বিবেচনা করা হলো না—এসব প্রশ্নের কোনো সন্তোষজনক উত্তর আজও পাইনি। এ বিষয়ে ৯ আগস্ট ইউজিসি চেয়ারম্যান বরাবর বিস্তারিত লিখিত অভিযোগ করেছি। পরবর্তীতে ৩১ অক্টোবর নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পুনরায় ইউজিসিতে চিঠি ও ইমেইলের মাধ্যমে অভিযোগ পাঠিয়েছি।”
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমি কারও ব্যক্তিগত বিরোধিতা করছি না। আমার দাবি হলো, ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী প্রকৃত একাডেমিক রেকর্ডের ভিত্তিতে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত পুনর্মূল্যায়ন করা হোক। একই সঙ্গে পূর্ববর্তী মনোনয়ন পরিবর্তন, গাণিতিক ফ্যাক্টর প্রয়োগ, নম্বর সংরক্ষণে ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা হোক। আমি ইউজিসির নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন চাই।”
অভিযোগ ও নম্বর সংরক্ষণের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মো. মাহবুব হোসেন বলেন, “এখানে আমাদের কোন কিছু করার নেই। বিভাগ থেকে যেভাবে ডাটা এন্ট্রি করে সেভাবে আমাদের কাছে ডাটা সংরক্ষিত থাকে। রেজাল্ট যেহেতু ডিপার্টমেন্ট প্রধানের সুপারিশের মাধ্যমে আসে তাই আপনি বিভাগে যোগাযোগ করেন। প্রথম দাবি করা দুইজনের মার্ক যদি না থাকে তাহলে কি ভুয়া ডিগ্রি দেওয়া হয়েছে!”
বিএমবি বিভাগের বর্তমান বিভাগীয় প্রধান মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল শোয়েব বলেন, “তাকে (সানজিদা) প্রথম মনোনয়ন দিয়েছিল আমি সেটি সম্পর্কে অবগত ছিলাম। এখন ইউজিসিতে পুনঃযাচাইয়ের জন্য শুনেছি সানজিদা আক্তার অভিযোগ জানিয়েছেন। তাই আমি এখন এই বিষয়ে আর কিছু বলতে চাচ্ছি না। এটা এখন ইউজিসি যাচাই করবে। সকল কোর্সের নম্বর বিভাগে থাকে না। অনেকগুলো নন-মেজর কোর্স থাকে। সকল কোর্সের নম্বর পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তরে পাওয়া যেতে পারে।”
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম বলেন, “এই সকল বিষয় ডিপার্টমেন্ট ও ডিনের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। তোমার কিছু জানার থাকলে ডিনের সাথে যোগাযোগ করো। তাদের কমিটি গঠন করা আছে।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মো. ফারুক মিয়া কথা বলতে রাজি হননি। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার কালাম আহমেদ চৌধুরীকে একাধিকবার কল করা হলেও তাঁর সাড়া মেলেনি।


