আধুনিক ডেস্ক ::
তরুণ বয়সে উন্নত জীবনের আশায় লন্ডন যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন ইসাক মিয়া। স্বপ্ন পূরণে জমি বিক্রির টাকা নিয়ে সিলেট আসেন তিনি। সেখানে দালালের খপ্পরে পড়ে তার আর লন্ডন যাওয়া হয়ে ওঠেনি। স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ায় বাড়িতেও ফেরা হয়নি। এরপর পথে পথে কেটে গেছে জীবন। ইসাক মিয়ার বর্তমান বয়স ৮০ বছর ছুঁইছুঁই। জীবনের পড়ন্ত বেলায় অনেকটা মানসিক ভারসাম্যহীন এই বৃদ্ধকে খুঁজে পেয়েছেন স্বজনরা। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর সন্ধান পেয়ে গতকাল মঙ্গলবার কুষ্টিয়ার কুমারখালী রেলস্টেশনে ছুটে আসেন ভাগনে ও ভাতিজা। দুপুরে ওই বৃদ্ধকে তাদের হাতে তুলে দেয় উপজেলা প্রশাসন।
ইসাক মিয়ার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার বুড়িশ্বর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামে। মৃত সাদ মিয়ার সাত সন্তানের মধ্যে ইসাক সবার ছোট। মহান মুক্তিযুদ্ধের পরপর বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নে জমি বিক্রি করে ৭৫ হাজার টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। এরপর থেকে নিখোঁজ ছিলেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে রোগশোকে কাতর হয়ে সম্প্রতি কুমারখালী রেলস্টেশনে অবস্থান করছিলেন। তার অবস্থা দেখে চিকিৎসা ও খাবারের ব্যবস্থা করেন স্থানীয়রা। এরপর একটি জাতীয় দৈনিকের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওর সূত্রে তার খোঁজ পান স্বজনরা। কুমারখালীতে আসেন ভাগনে বাচ্চু মিয়া (৬০) ও হাজী সাজাহান মিয়া (৬৫) এবং ভাতিজা তাহের মিয়া (৩৫)।
গতকাল কুমারখালী রেলস্টেশনে দেখা গেছে, বয়সের ভারে অনেকটা নুইয়ে পড়েছে ইসাকের শরীর। অসুস্থ শরীর নিয়ে কখনও বসছেন চেয়ারে, কখনওবা মেঝেতে শুয়ে পড়ছেন। তাঁকে পেয়ে আবেগাপ্লুত স্বজনরা। ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে ইসাক মিয়া বলেন, ‘বিদেশ যাওয়ার লাইগা জাগাজমি সব বেইচা দিয়া সিলেট গেছলাম। দালালে টেহা মাইরা দিছে। পাগলের মতো পথে পথে ঘুরছি। আজ ভাগনে নিতে আইছে। বাড়ি যামু। ভাল লাগছে।’
তার ভাগনে বাচ্চু মিয়া জানান, তার মায়েরা সাত ভাই-বোন। তারা হলেন কালা মিয়া, ধলা মিয়া, ইসাক মিয়া, জজ বানু, কালেস্টার বানু, বালেস্টার বানু ও মালেস্টার বানু। তাঁর ছোট মামা ইসাক মিয়ার লন্ডনে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল। সেজন্য সাত ভাই-বোন মিলে প্রায় ৫৫ বছর আগে দুই বিঘা জমি ও ৪০ শতাংশ বসতভিটা ৭৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেছিলেন। সেই টাকা নিয়ে মামা বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিখোঁজ হন। তাঁর ভাষ্য, ইসাক মিয়া ছাড়া তাঁর আর কোনো ভাই-বোন বেঁচে নেই।
আরেক ভাগনে সাজাহান মিয়ার ভাষ্য, সপ্তাহখানেক আগে অনলাইনে এক ভিডিওতে দেখা যায় কুমারখালী স্টেশনে তাঁর মামা ইসাক। তিনি গ্রামের নাম ও তাঁর বাবা-ভাইদের নাম বলছেন। পরে স্থানীয় সাংবাদিক মনোয়ারের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে নিতে এসেছেন। তাঁর বাড়িতে কেউ নেই। তারাই তাঁর চিকিৎসা করাবেন এবং যতদিন বাঁচেন আদরযত্নে রাখবেন। ভাতিজা তাহের মিয়া বলেন, ‘বাবার মুখে চাচার অনেক গল্প শুনতাম। এত দিন পরে চাচাকে ফিরে পাব তা কল্পনাও করিনি। বাবা বেঁচে থাকলে অনেক খুশি হতেন।’
ব্যবসায়ী আবু বক্কর সিদ্দিক জানান, প্রায় ২৬ দিন আগে কুমারখালী স্টেশনের পাশে অচেতন অবস্থায় পড়েছিলেন ইসাক মিয়া। প্রথমে সবাই ভেবেছিলেন মৃত। তবে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়ার পর কথা বলা শুরু করেন।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, প্রায় ৫৫ বছর পথে পথে ঘুরে গণমাধ্যমের কল্যাণে ইসাক মিয়া বাড়িতে ফিরছেন। যাচাই-বাছাইয়ের পর তাঁকে স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।


