শাবিপ্রবি প্রতিনিধি:
বাংলাদেশের তরুণদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে দেশের ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ (কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সুবিধা) নষ্ট হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু সার্টিফিকেট দেওয়ার প্রতিষ্ঠান না বানিয়ে, দক্ষ ও যোগ্য মানুষ তৈরির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) শাখা ছাত্রশিবির আয়োজিত প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নবীনদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মানেই জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ে প্রবেশ করা। প্রথম বর্ষেই নিজের লক্ষ্য ঠিক করে সেই অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু স্বপ্ন দেখার জায়গা নয়, স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নেওয়ার মাঠ।”
সময়ের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি উদাহরণে বলেন, “পৃথিবীতে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রাণী ডাইনোসর টিকে থাকতে পারেনি, কিন্তু তেলাপোকা এখনো টিকে আছে। কারণ, তেলাপোকার অভিযোজন ক্ষমতা বেশি। জীবনের ক্ষেত্রেও এটি সত্য; পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে বদলাতে না পারলে কেউ টিকে থাকতে পারবে না।”
বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করার পর চাকরির জন্য সবাইকে হন্যে হয়ে ছুটতে হয়। বিসিএসের জন্যই ৫-৬ বছর প্রস্তুতি নিতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর কেন আবার পাঁচ-ছয় বছর বিসিএসের জন্য পড়তে হবে? বিশ্ববিদ্যালয় যদি সঠিক দক্ষতা তৈরি করতে পারত, তবে শিক্ষার্থীরা সরাসরি কর্মক্ষেত্রে যোগ দিতে পারত।”
বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পের সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো বিভাগ চালুর আগে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়, যাতে পাস করার পর শিক্ষার্থীদের দ্রুত কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এমন আধুনিক ব্যবস্থা চালুর আহ্বান জানান তিনি।
ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড প্রসঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, একটি দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সময়কাল খুবই সীমিত। এই সুযোগ কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যতে অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়বে। চীন, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এসব দেশ কেবল দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করেই অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে।শিক্ষার্থীদের ক্যারিয়ার গঠনের পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, শুধু ভালো সিজিপিএ অর্জন করলেই চলবে না। বর্তমান যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), পাইথন, এক্সেল, গবেষণা, পরিসংখ্যান এবং ইংরেজি ভাষায় দক্ষ হতে হবে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “অর্থনীতি আমাদের বলে পৃথিবীতে সম্পদের স্বল্পতা রয়েছে। কিন্তু সম্পদের অভাবের চেয়ে বড় সমস্যা সম্পদের অসম বণ্টন। বিশ্বের মাত্র ৫ শতাংশ মানুষের হাতে ৯০ শতাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত থাকায় বৈষম্য দিন দিন বাড়ছে। সুশাসন ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া এই বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ছাত্রশিবির সভাপতি বলেন, “একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করিয়ে যদি থাকার ব্যবস্থা করা না যায়, তবে তাকে ভর্তি করানো কেন? আবাসন নিশ্চিত করতে না পারা রাষ্ট্রের ব্যর্থতা।” এ সময় তিনি গণরুম-গেস্টরুমের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার দাবি জানান।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ভালো বন্ধু নির্বাচন করতে হবে এবং শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হতে হবে। “যে শিক্ষকের ভালো গবেষণা আছে, তার সান্নিধ্যে বেশি যান। গ্রুপ স্টাডি করুন, একে অপরকে সহযোগিতা করুন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতার সংস্কৃতিও থাকতে হবে।”
রাজনীতি প্রসঙ্গে সাদ্দাম বলেন, শিক্ষার্থীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, তবে মূল লক্ষ্য হতে হবে জ্ঞান অর্জন ও দেশ গঠনে ভূমিকা রাখা। মেধাবীরা রাজনীতিতে এলে রাষ্ট্র আরও ভালোভাবে পরিচালিত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বক্তব্যের শেষদিকে তিনি মনে করিয়ে দেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি বড় বিনিয়োগ। তাই শিক্ষার্থীদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। নিজের পরিবার, সমাজ ও দেশের কথা মাথায় রেখে নিজেকে দক্ষ, সৎ ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।


