নাজিম উদ্দিন , লাখাই:
যে মা সন্তানদের জন্ম দিয়ে লালন পালন করে বড় করেছেন, জীবনের দীর্ঘ সময় সন্তানদের জন্য কষ্ট করেছেন বয়সের ভারে নুয়ে পড়া সেই মায়েরই আজ ঠাঁই নেই নিজের সন্তানদের ঘরে। আশ্রয়ের সন্ধানে মানুষের দ্বারে দ্বারে থানায় ঘুরছেন হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার ভাদিকারা গ্রামের বৃদ্ধা ফুলবানু বেগম (৮০)।
ফুলবানুর স্বামী মুর্তুজ আলী অনেক আগে মারা যান। এরপর চার সন্তানকে নিয়ে তিনি সংসার করছিলেন। একপর্যায়ে এক ছেলে টাকার প্রয়োজনের কথা জানালে নিজের বাড়ি বিক্রি করে তাকে টাকা দেন বলে জানান ফুলবানু। বয়সের ভারে বর্তমানে তিনি আর কাজ করতে পারছেন না। এ অবস্থায় সন্তানদের কাছেই আশ্রয় চাইলেও কোনো ছেলে তাকে নিজেদের ঘরে থাকতে দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
আশ্রয়ের জন্য কখনো প্রতিবেশীর বাড়িতে, আবার কখনো স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে ছুটে বেড়াচ্ছেন ফুলবানু। কিছুদিন ধরে তিনি স্থানীয় এক ইউপি সদস্যের বাড়িতে অবস্থান করছেন। শেষ পর্যন্ত সন্তানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে লাখাই থানায় যান তিনি।
থানায় উপস্থিত তিন ছেলের সামনে ফুলবানু লাখাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শরীফ আহমেদের কাছে আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, জীবনের শেষ সময়টা তিনি সন্তানদের সঙ্গেই কাটাতে চান।
ফুলবানু কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার ছেলে জাকির মিয়া আমাকে ভরণপোষণ করবে এবং অসুস্থ হলে চিকিৎসা করাবে—এ কথা বলে আমার কাছ থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়েছে। টাকা নেওয়ার পর আমাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে। আমার চার ছেলে, কিন্তু কেউ আমাকে ঘরে থাকার জায়গা দেয় না। এখন আর কোনো ছেলে আমার খোঁজখবরও নেয় না। কিছুদিন ধরে স্থানীয় এক মেম্বারের বাড়িতে আছি। ওসি স্যার, আমি এখন আমার ছেলেদের সঙ্গে বাকি জীবনটা থাকতে চাই। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওদের সঙ্গে থাকতে চাই, আর ওদের হাতেই যেন আমার কবরে মাঠি হয়।”
লাখাই থানার ওসি শরীফ আহমেদ বলেন, “অসহায় ও আশ্রয়হীন ফুলবানু ছেলেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে থানায় এসেছেন। তার অভিযোগ, এক ছেলে ভরণপোষণ ও চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলে ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়েছেন। পরে তাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তিনি ছেলেদের সঙ্গে থাকতে চান। আমরা ছেলেদের তার ভরণপোষণ ও দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়ে বলেছি। বর্তমানে তিনি স্থানীয় এক আত্মীয়ের বাড়িতে রয়েছেন।”
এদিকে ওসি শরীফ আহমেদের ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে তেঘরিয়া যুব সংসদের পরিচালক মায়ানুর আক্তার বৃদ্ধা ফুলবানুর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি ফুলবানুকে নগদ ৫ হাজার টাকা সহায়তা দিয়েছেন। পাশাপাশি এখন থেকে প্রতি মাসে ২ হাজার টাকা করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। প্রয়োজন হলে তার চিকিৎসার খরচও বহন করার কথা জানিয়েছেন তিনি।
বৃদ্ধা ফুলবানুর আকুতি—জীবনের শেষ দিনগুলো যেন সন্তানদের কাছেই কাটাতে পারেন। সন্তানদের ঘরে যেন মায়ের জন্য একটু আশ্রয়ের জায়গা হয় এটাই তার শেষ প্রত্যাশা।


