হিমেল হান্নান, শাবি:
সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (শাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন আগামী ১৭ ডিসেম্বর (বুধবার ) অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন। ১৯৯৭ সালের পর থেকে ২৭ বছরের অচলাবস্থা অবসান ঘটিয়ে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার একটি বড় সুযোগ হিসাবে দেখছেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু দীর্ঘসূত্রিতার কারণে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা,সময় মতো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে রয়েছে সংশয় ।
১৯৯১ সালে প্রথম শাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু হয়। ১ম ও ২য় নির্বাচনে ভিপি পদ যুক্ত করা হয় নি। এতে করে প্রতিষ্ঠাতা জিএস হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন নুরুজ্জামান জামান এবং এজিএস আক্তার হুসেন মিঠুন। তৃতীয় নির্বাচনে ভিপি পদ অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর শাকসু’র প্রথম ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন আব্দুস সালাম এবং জিএস সাব্বির চৌধুরী। সর্বশেষ শাকসু’র ভিপি ছিলেন কামরুল ইসলাম কাবেরি, জিএস ছিলেন মামুনুর রশীদ মামুন। এরপর আর কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি,কেটে গেছে ২৭ টি বছর।
৫ আগস্টের পর প্রতি ক্যাম্পাসে দাবি উঠে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের। এরই ধারাবাহিকতায় শাবিপ্রবিতে শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কাছে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে তাদের এ দাবি উপস্থাপন করেন। উপাচার্য শিক্ষার্থীদের আশ্বাস দেন ডাকসু হলে শাকসু হবে। অতপর ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবার পর শিক্ষার্থীরা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি দিতে থাকে। কিন্তু একটি পক্ষ ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি চালু নয় দেখে শাকসুর জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড দাবি করেন। এরই প্রেক্ষিতে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি চালু হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বাচনের গঠনতন্ত্র পুনঃপণয়ন করে। নতুন চারটি পদ যুক্ত করা হয়। একই সাথে হল সংসদের জন্য গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করা হয়। উল্লেখ্য এর আগে শাবিপ্রবিতে হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় নি।
পরবর্তীতে দেখা যায় ছাত্রদল লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষার কথা বলে শাকসু দেরিতে দেওয়ার জন্য স্মারক লিপি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে। এর পূর্বে উপাচার্য বলেছিলেন নভেম্বরের ২য় সপ্তাহে নির্বাচন দিবেন। কিন্তু তাদের এসব দাবির প্রেক্ষিতে নভেম্বরের ২য় সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তফসিল করা ঘোষণা হয়নি। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের রাতভর আন্দোলন মুখে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কচ্ছপ গতিতে তাদের কাজ করতে থাকে। এতে করে শিক্ষার্থীরা আরো কঠোর আন্দোলনের দিকে যেতে প্রস্তুত হলে ডিসেম্বর এর ১৭ তারিখ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে উপাচার্য। সে তারিখ নিয়ে দেখা যায় অসন্তোষ। উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় তারিখ এগিয়ে নিয়ে আসার জন্য। উপাচার্য তারিখ বিবেচনার আশ্বাস দিলে আগানো হয় নি তারিখ। ১৭ তারিখ নির্বাচনের দিন ঠিক রেখেই তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।
অন্যদিকে ছাত্রশিবির, ছাত্র মজলিস, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ,বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন সহ সকল ধারার ছাত্র সংগঠন গুলো নভেম্বরে নির্বাচন আয়োজনের জন্য আন্দোলন করতে থাকে। নির্বাচন আয়োজনের জন্য একতাবদ্ধ হয়ে প্রশাসনকে এসকল সংগঠন চাপ দিতে থাকে।
১৭ তারিখ নির্বাচন আয়োজন নিয়ে এসব সংগঠন ও শিক্ষার্থীরা বলছেন শাকসু নির্বাচন বানচালের চেষ্টা চলছে। এজন্যই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হবার ক্রান্তিলগ্নে নির্বাচনের তারিখ ঠিক করা হয়েছে।
তাদের দাবি উপাচার্য নির্বাচনের তারিখ ছাত্রদলের চাপে পড়ে এবং তাদেরকে খুশি করার জন্য ১৭ ডিসেম্বর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারা আরো বলেন, এ সময় নির্বাচন হলে ১০ ভাগ ভোটার ভোট দেওয়ার জন্য ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন না। এই সময়টা শীতকালীন ছুটি থাকে। শিক্ষার্থীদের জোর করে আটকে রাখা যাবেনা,শিক্ষার্থীদের মাঝে নির্বাচনের কোনো আমেজ থাকবে না।
নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্র সংগঠন গুলো নানামুখী কল্যানমূলক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করেছিল যা শিক্ষার্থীদের কে নতুন ভাবে ভাবতে শেখাচ্ছিল । কিন্তু প্রশাসনের শিক্ষার্থীবান্ধব মনোভাব না থাকায় সেই ভাবনায় নেতিবাচক প্রভাব পরেছে বলে জানা যায় ।বেশির ভাগ সংগঠন প্রশাসনের সিদ্ধান্তের কারণে নির্বাচন বিমুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ।ছাত্রদল আন্দোলন কারী শিক্ষার্থীদেরকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অযৌক্তিকভাবে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে সহিংস কর্মকাণ্ড এবং মব সৃষ্টিকারী হিসাবে উল্লেখ করেন।এদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন ।
শাকসু নির্বাচন নিয়ে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইব্রাহীম আদহাম সৌরভ আধুনিক কাগজকে বলেন,দীর্ঘ সময় পর নির্বাচন হতে যাচ্ছে, আমরা চাই শাকসু হোক। আমাদের যৌক্তিক দাবি সমূহ যথাযথ ভাবে সমাধান করার জন্য এই নির্বাচন যথাসময়ে আয়োজন করা দরকার । শাকসু নির্বাচন বানচালের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সব কিছু মোকাবিলা করে একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও উৎসব মুখর শাকসু নির্বাচন যাতে হয় এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলা বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন,শাকসু নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ভোট দিব এই ভাবনাটা আমার ভেতরে এক ধরনের নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে । নির্বাচনী পরিবেশ থাকবে কিনা জানিনা তবুও আমি বলবো , সম্ভাব্য প্রার্থীরা সবকিছু মেনে নিয়ে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহন করবেন । আমার চাই যারাই নির্বাচিত হোক না কেন তারা যেন শিক্ষার্থীর স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। আমাদের সমস্যা, অধিকার আর সুযোগ-সুবিধা গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে একটি নিরাপদ, স্বচ্ছ ও প্রাণবন্ত ক্যাম্পাস গড়ে তোলেন।
১৭ ডিসেম্বর নির্বাচন হলে উৎসব মুখর হবে কিনা জানতে চাইলে নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনিম আল মামুন বলেন, শাকসু নির্বাচন উৎসব মুখর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম রয়েছে। কারণ ডিসেম্বর মাসে সবার পরিকল্পনা থাকে বাসায় যাওয়ার। শুধু নির্বাচনের জন্য শিক্ষার্থীরা এতোদিন অপেক্ষা করবে বলে আমার মনে হয় না।
নির্বাচনের সংশয় উল্লেখ করে তিনি বলেন যখন প্রশাসন দেখবে ভোটার নেই তখন নির্বাচন স্থগিত করতে পারে যার কারণে নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধের পর সমসাময়িক নানা প্রতিকূলতায় নির্বাচন না হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে ।
