নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ:
বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকসহ বিরল প্রজাতির বন্যপ্রাণী, উদ্ভিদ ও বৃক্ষরাজি সমৃদ্ধ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। সম্প্রতি প্রচণ্ড গরমে জনজীবনের পাশাপাশি ওষ্ঠাগত হয়ে উঠে লাউয়াছড়া বনের প্রাণীকূলও। বন উজাড়, বৃক্ষ নিধনসহ নানা কারনে শুষ্ক মৌসুমে বন্যপ্রাণির খাবার পানি সঙ্কটও দেখা দেয়। সম্প্রতি কয়েকদফা বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরেছে প্রকৃতিতে। প্রাণচাঞ্চল্য দেখা দিয়েছে বন্যপ্রাণির মধ্যে। জাতীয় উদ্যানে বানর, উল্লুক ও শূকরের সংখ্যাও বৃদ্ধির দাবি সংশ্লিষ্টদের। করোনার সময়ে বনের নিরব, নিস্তব্ধ পরিবেশ বৃক্ষকূল ও বন্যপ্রাণীর মধ্যেও স্বস্তি ফিরে আসে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সনের মার্চ মাসের শেষ সময় থেকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পর্যটকদের জন্য বন্ধ ছিল লাউয়াছড়া উদ্যান। সে সময়ে সংরক্ষিত বনে মানুষের উৎপাত, হাল্লা-চিৎকার বন্ধ ছিল। এক বছরের ব্যবধানেই বনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে পরিবর্তন দেখা দেয়। পর্যটক শুন্য নি:স্তব্দ বনে হাল্লা-চিৎকার ও অবাদে বিচরণ করে বন্যপ্রাণী। গাছে গাছে পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর বৃক্ষরাজিতে নতুন পত্রপল্লবে সুশোভিত হয়ে উঠে বন। উল্লুকের আওয়াজ, বানরের লাফালাফি, পাখির কলরব, বনমোরগের ডাক শুনা যেতো। করোনাকালীন পর্যটন কেন্দ্র বন্ধ থাকায় প্রাণ ফিরে প্রকৃতিতে। বন্যপ্রাণির মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য প্রকৃতি ও পরিবেশকে সমৃদ্ধ করে তুলে।
স্থানীয়রা জানান, বিরল প্রজাতির গাছ, নানা প্রজাতির পাখির ডাক, ছড়া, বনফুল, অর্কিড, চশমাবানর, বিশ্বের বিলুপ্ত প্রায় দূর্লভ উল্লুক এই বনের বিশেষ আকর্ষন। অরণ্যের আচ্ছাদিত, বন্যপ্রাণী, পাখি ও পাহাড়ী ঝর্ণার কলধ্বনিতে মুখরিত লাউয়াছড়া। ক্রমাম্বয়ে বনের প্রাকৃতিক গাছগাছালি বিলীন হওয়ায় শুষ্ক মৌসুমে পাহাড়ি ছড়া ও খাল শুকিয়ে যায়। তৃষ্ণা মেটাতে লোকালয়ে ছুটাছুটি করতে গিয়ে ট্রেন ও যানবাহনের নিচে কাটা পড়ে মারা যায় বন্যপ্রাণি। তবে অনুকূল পরিবেশে ও করোনাকালীন বনের স্বাভাবিকতা বর্তমানে লাউয়াছড়া বনে বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের প্রজননও কিছুটা বেড়েছে। তাছাড়া বানর ও শূকরের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বনের ঘন বনজঙ্গল হ্রাস পাওয়ায় বস্তির বাসাবাড়িতে বানর ও শূকরের উৎপাত বৃদ্ধি পেয়েছে।
১২৫০ হেক্টর আয়তনের বনটিকে ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষনা করা হয়। সে সময়ের সার্ভে অনুযায়ী ৪৬০ প্রজাতির প্রাণ বৈচিত্র্যে ভরপুর উদ্যানটিতে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে সেগুন, গর্জন, মেনজিয়াম, চাপালিশ, ডুমুর, কদম, জলপাই, চাউর বা বন সুপারি, বনোকলা, শ্যাওড়া, কৃষ্ণচুড়া, গামাই, ছাতিম, বন পেঁপে, মৃর্তিংঙ্গা, কাঁকরা, বাতা, বাজনা, বন রুই, ঝাওয়া, জগডুমুর, কাইমুলা, করই, আওয়াল, জাম, জাম্বুরা লটকন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ৪ প্রজাতির উভয়চর প্রাণী, ৬ প্রজাতির সরিসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির অর্কিড, ২০ প্রজাতির স্তন্যপ্রায়ী প্রাণী এবং ১৭ প্রজাতির পোকামাকড় রয়েছে। বৃষ্টিপাতের কারনে বৃক্ষরাজি গুলোতে পত্রপল্লবে সুশোভিত হয়ে উঠে। পাখির কলরব, বন্যপ্রাণী ও পোকামাকড়ের অবাধ বিচরন প্রকৃতিতে সজিবতা জাগিয়ে দেয়।
অনুকূল পরিবেশে পশু-পাখি ও পোকা মাকড়ের অদ্ভুত ঝিঝি শব্দ, বানরের ভেংচি, ভালুকের গাছে গাছে ছুটাছুটির দৃশ্য চোখে পড়ে। ঘন সন্নিবেসিত বনটি নানা কারণে অবক্ষয়ের সৃষ্টি হয়েছে। এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাবারের সংকট প্রবল হচ্ছে। ফলে লাউয়াছড়ায় আগ্রাসী হয়ে উঠছে বানরসহ অন্যান্য প্রাণী।
স্থানীয় প্রকৃতি প্রেমী জনক দেব বর্মা জানান, বনের নিরব, নিস্তব্দ খোলামেলা পরিবেশে গাছে গাছে বন্যপ্রাণী ঘুরাঘুরি করতে দেখা যায়। আগে সচরাচর এভাবে দেখা যায়নি।
লাউয়াছড়া বনরেঞ্জ কর্মকর্তা মো. সহিদুল ইসলাম বলেন, বৃষ্টিপাতের কারনে বনের সজিবতা ফিরে পেয়েছে। তাছাড়া এখন বানর, শূকরের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালের দিকে নানা সময়ে বন্যপ্রাণী বনের বাইরে চলে যেতো। এখন সেরকম হচ্ছে না।
এব্যাপারে মৌলভীবাজারস্থ বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার বলেন, উল্লুকের প্রজনন বাড়ার কথা। তাছাড়া ধারণা করা হচ্ছে বানর ও শূকরের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় সম্প্রতি প্রচণ্ড গরমে সারাদেশের তাপমাত্রার সাথে লাউয়াছড়াসহ শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ এলাকার তাপমাত্রার পার্থক্য ছিল। এটি বন্যপ্রাণীর জন্য অনুকূল পরিবেশ। তিনি আরো বলেন, লাউয়াছড়ায় মিশ্র ও ফলজ বনায়ন বন্যপ্রাণীর জন্য উপকার বয়ে আনতে পারে।