কুহিনূর রহমান নাহিদ, শান্তিগঞ্জ:
অতিবৃষ্টির শঙ্কায় সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে শ্রমিক সংকটের পাশাপাশি সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈরী আবহাওয়া। টানা বৃষ্টিপাত ও রোদ না থাকায় ধান কাটা ও শুকানো- দুই প্রক্রিয়াই মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২২ হাজার ৬১২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪৩ হাজার ৬৯২ মেট্রিক টন, যার সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৩৯৭ কোটি টাকা। এ উৎপাদন থেকে প্রায় ৯৪ হাজার ৮৩৭ মেট্রিক টন চাল পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। উপজেলায় ব্রি ধানসহ বিভিন্ন উন্নত জাতের বোরো ধানের চাষ হয়েছে।
এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ৪২৩ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে, যা মোট আবাদকৃত জমির প্রায় ৫৭ শতাংশ। তবে দেখার হাওরে ইতোমধ্যে প্রায় ৫৮ শতাংশ ধান কর্তন সম্পন্ন হয়েছে বলে কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে।
বর্তমানে হাওরাঞ্চলে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে টানা অতিবৃষ্টি। প্রতিদিন বৃষ্টি থাকায় কৃষকরা মাঠে নামতে পারছেন না। আবার যেসব ধান কাটা হচ্ছে, সেগুলো রোদ না থাকায় শুকানো যাচ্ছে না। এতে ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
এদিকে আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাসের বরাতে উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, আগামী ২৩ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সাত দিনজুড়ে হাওরাঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাতসহ বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে। এ পরিস্থিতিতে যেসব জমির ধান প্রায় ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেসব ধান দ্রুত কেটে নেওয়ার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
কৃষকরা জানান, খোলা মাঠে ধান রাখলে বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকায় অনেকেই খলায় ধান তুলে ত্রিপল বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখছেন।
বৈশগাঁও হাওরের কৃষক শারিফ মিয়া বলেন, অনেক ধান এখনো কাটা হয়নি। পানি বাড়লে সব ডুবে যাওয়ার ভয় আছে। খলায় ঢেকে রাখলেও বৃষ্টির পানিতে কিছু ধান অঙ্কুরিত হয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।
দেখার হাওরের কৃষক হাবিবুর মিয়া বলেন, ধান কাটলেও শুকাতে পারছি না। রোদ না থাকায় ভিজা ধান নিয়ে খুব বিপদে আছি।
দেখার হাওরের কৃষক রাজা মিয়া বলেন, ফলন ভালো হয়েছে এবং ধান পেকেছে। আমার প্রায় অর্ধেক কাটা শেষ। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে বাকি ধান কাটতে দেরি হচ্ছে। অতিবৃষ্টি হলে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে ধান ঘরে তুলতে পারব, না হলে বড় ক্ষতির মুখে পড়ব।
শ্রমিক সংকটও পরিস্থিতিকে কিছুটা প্রভাবিত করছে। বর্তমানে শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। তবে কৃষকরা বলছেন, মূল সমস্যা এখন আবহাওয়া।
যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান কাটার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে হাওরাঞ্চলে বর্তমানে ১২২টি হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা চলছে। একটি হারভেস্টার দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৪ থেকে ৫ হেক্টর জমির ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে। এসব হারভেস্টারের জন্য আবেদন সাপেক্ষে প্রতি মেশিনে ১০০ থেকে ১২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল তেল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এতে দ্রুত ধান কাটার কাজ কিছুটা গতি পেয়েছে।
অন্যদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের ঝুঁকি রয়েছে। যদিও এখনো বড় ধরনের কোনো বাঁধ ভাঙনের ঘটনা ঘটেনি, তবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো নজরদারিতে রাখা হয়েছে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় মেরামতের কাজও করা হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের আবহাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আহসান হাবিব বলেন, বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতিতে অতিবৃষ্টির কারণে ধান কাটা ও শুকানো- দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা হচ্ছে। আমরা কৃষকদের সতর্ক করেছি এবং যেসব জমির ধান প্রায় ৮০ শতাংশ পেকে গেছে, সেগুলো দ্রুত কেটে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহজাহান বলেন, হাওরের পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। উপজেলার প্রতিটি মসজিদে মাইকিং করে কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার আহ্বান জানানো হচ্ছে। কৃষকদের সহায়তায় প্রশাসন কাজ করছে।
