শাবিপ্রবি প্রতিনিধি:
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) সাবেক রেজিস্ট্রার সৈয়দ সেলিম মোহাম্মদ আব্দুল কাদিরের প্রায় ৩২ বছরের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ কর্মজীবনের অবসান ঘটেছে। বিদায়বেলায় তিনি তাঁর কর্মজীবনের স্মৃতি, অনুভূতি ও ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। দীর্ঘ পথচলা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাটানো নিজের অভিজ্ঞতা এবং আবেগের কথা স্মরণ করেছেন তিনি।
শাবিপ্রবিতে আসার পেছনে রয়েছে একটি অনন্য স্মৃতি। তিনি যখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের স্নাতকোত্তরের (মাস্টার্স) ছাত্র, তখন শাবিপ্রবির প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক ড. ছদরুদ্দিন আহমদ চৌধুরীর মেয়াদের শেষভাগে ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার সুযোগ পান। তখন ক্যাম্পাসে তাঁর পরিচিত বলতে ছিলেন কেবল তৎকালীন সহকারী প্রকৌশলী (পরবর্তীতে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত) সৈয়দ হাবিবুর রহমান।
ক্যাম্পাস ঘুরে দেখার একপর্যায়ে প্রশাসনিক ভবন-২ এর সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে এক প্রবল ইচ্ছা জাগে—যদি শাবিপ্রবির সেকশন অফিসার পদে একটি চাকরি হয়, তবে জীবনের পথচলার জন্য আর কিছুই লাগবে না। তখনই মহান আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানান তিনি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে তাঁর প্রিয় বন্ধু কামরুলের (বর্তমানে নিউইয়র্ক প্রবাসী) সাথেও মনের এই ইচ্ছাটি ভাগ করে নিয়েছিলেন।
অবশেষে ১৯৯৪ সালের ২৯ অক্টোবর শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকশন অফিসার হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। তৎকালীন উপাচার্য বুয়েটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মহিবউদ্দিন আহমদের সময়কালে তিনি যোগ দেন, যাঁর মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ নির্মিত হয়েছিল।
পরবর্তীতে উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমানের মেয়াদের সময়ে তাঁর ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে কাজ করার সুযোগ পান। ২০০০ সালে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে তৎকালীন উপাচার্যের তাৎক্ষণিক ও আন্তরিক সিদ্ধান্তের কথাও তিনি স্মরণ করেন।
২০০১ সালে পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করা উপাচার্য অধ্যাপক মো. শফিকুর রহমান এবং অধ্যাপক ড. মোসলেহ উদ্দিন আহমদের আমলেও একাধিক দায়িত্ব সামলান তিনি। উপাচার্য অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিনের সময়ে তিনি উপ-রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার পদে প্রায় ১১ বছর সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালনের পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রধান ডিন অধ্যাপক সৈয়দ বদিউজ্জামান ফারুকের আহ্বানে তিনি ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. এম. সারওয়ার উদ্দিন চৌধুরীর সময়ে তিনি রেজিস্ট্রার পদে স্থায়ীভাবে নিয়োগ পান এবং সিন্ডিকেটের অনুমোদনক্রমে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত হন। এরপর বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সময়েও দায়িত্ব পালন করার পর, সর্বশেষ সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে তাঁর চুক্তিভিত্তিক মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে।
৩২ বছরের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সৈয়দ সেলিম মোহাম্মদ আব্দুল কাদির বলেন, “পেছনে ফিরে তাকালে শাবিপ্রবিতে কাটানো এই দীর্ঘ সময়ের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও অর্জনগুলো আজ আমার কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। এ পথচলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকারী মাননীয় উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সর্বস্তরের সদস্যদের সাথে কাজ করার সুযোগ আমার কর্মজীবনকে সমৃদ্ধ করেছে।”
শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “ছাত্রছাত্রীরাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ এবং এর অগ্রযাত্রার প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের মেধা, পরিশ্রম ও সাফল্যের মাধ্যমেই আজ শাবিপ্রবির এত গৌরবময় ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে।”
১৯৯১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৩টি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করা শাবিপ্রবি আজ ৭টি অনুষদ ও ২৮টি বিভাগ নিয়ে বিস্তৃত। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণায় শাবিপ্রবি তার বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ধরে রেখেছে বলে
জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রাখার মুহূর্তে তিনি মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়টির সুদূরপ্রসারী সাফল্য কামনা করে সবার দোয়া ও শুভকামনা চেয়েছেন।
তার বিদায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাঁর দীর্ঘায়ু, সুস্বাস্থ্য ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান।


