হিমেল হান্নান, শাবি:
দীর্ঘ একযুগ ধরে ধীরে ধীরে ধ্বংস হচ্ছে ৫৮ ফুট উঁচু টিলার ওপর ৬ হাজার ৮৮৬ বর্গফুট জায়গা নিয়ে নির্মিত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার।
শহীদ মিনার সংস্কারের বিষয়টি একাধিকবার বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওঠে আসলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা হওয়ায় ২০১৬ সালের আগে থেকে শহীদ মিনারের বিভিন্ন জায়গায় ফাটলের সৃষ্টি হয়। যা বর্তমানে বেড়ে বড় গর্ত ও ফাটল সৃষ্টি হয়েছে।সরেজমিনে দেখা গেছে, ১০১টি সিঁড়িবিশিষ্ট এ শহীদ মিনারের সমতল থেকে উপরের দিকে ৯৫টি সিঁড়ি অতিক্রম করার পর মিনারের প্রথম বেদির উভয় পাশের রেলিংয়ে এক থেকে দেড় ইঞ্চির মোট ২টি চওড়া ফাটল। একই বেদি থেকে কয়েক পা এগিয়ে গেলে চোখে পড়ে বাম পাশের রেলিংয়ের নিচের দিকে সিরামিকের ইটগুলো ভেঙে প্রায় ১৫ ফুট দীর্ঘ জায়গা জুড়ে ৩ থেকে ৯ ইঞ্চি চওড়া গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সৃষ্টি হওয়া এ সব গর্তগুলোতে গাছের শুকনো পাতা জমা হচ্ছে প্রতিনিয়ত। মিনারের দ্বিতীয় স্তরে ওঠার সিঁড়িতে এবং মূল বেদির রেলিংয়ে সিরামিকের ১০টি ইট উধাও হয়ে গেছে।
এছাড়া, মূল বেদীর বামপাশের মাটি সরে গেছে।
এ বিষয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফয়সাল হোসেন বলেন,আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার ঐতিহ্যের প্রতীক। কিন্তু শহীদ মিনারটির অবস্থা দেখে মনে হয়, এটি খুব অবহেলিত স্থাপনা। দ্রুত সময়ের মধ্যে এটি সংস্কার করা জরুরি। আমি মনে করি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের চরম উদাসীনতা আর অবহেলার জন্য শহীদ মিনারের মতো ক্যাম্পাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা গুলো অকেজো ও সৌন্দর্যহানি ঘটছে।
পেট্রোলিয়াম এন্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের আরেক শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহীম বিন ইসলাম বলেন, এই ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা শিক্ষার্থী, দর্শনার্থী – সকলের জন্যই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ভূতাত্ত্বিক গঠন ও টেকটোনিকভাবে সক্রিয়তার বিষয়টি বিবেচনা করে টিলার ওপরে এই কাঠামোতে শহীদ মিনার নির্মাণ পরিকল্পনা দূরদর্শী চিন্তা-ভাবনার অভাব বলেই মনে হচ্ছে। এই কারণে নিয়মিত ফাটল ধরে এবং টিলার মাটি সরে গিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে শহীদ মিনার।
তিনি আরো বলেন, আমি প্রশাসনের সরাসরি অবহেলা বলবো না, তবে প্রশাসনের যেহেতু এসব নজরদারির মধ্যেই পড়ে সেহেতু প্রশাসন এই সংস্কারবিমুখতার দায় এড়াতে পারে না।
এ বিষয়ে সিভিল অ্যান্ড ইনভায়রনমেন্টাল ইন্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক জহির বিন আলম বলেন,আমাদের এখানে নয়টি ইন্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট রয়েছে অথচ আমরা জানিনা কোথায় কী হচ্ছে।দিনশেষে জবাবদিহিতার মুখে পরতে হচ্ছে আমাদের। আমাদের সুনাম নষ্ট করা হচ্ছে বারবার কারণ জনগণ তো জানেনা আমরা এইসব নির্মানে কোনো ভাবে জড়িত নেই।আমাদের বাসা নির্মান করলে ৫০ বছরও কিছু হয়না, কিন্তু এই সব স্থাপনা নির্মানে ১০ বছর ঠিকঠাক থাকেনা।আমাদের ফাঁসি হওয়া উচিত।
শহীদ মিনারের অবস্থার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন , শহীদ মিনারে যে ফেটল সৃষ্টি হয়েছে,ভূমিকম্পের সামান্য কম্পনে তা ভেঙে পরবে এতে কোনে সন্দেহ নেই। যেহেতু ভেঙে পড়ার পর উদ্যোগ নিয়ে কোনো লাভ নেই,তাই প্রশাসনকে আহ্বান করবো যাতে দ্রুত উদ্যােগ গ্রহন করেন।আমরা সব ধরনের টেকনিক্যাল সহায়তার প্রয়োজন হলে আমরা প্রস্তুত আছি।
বিষয়টি জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ. এম. সরওয়ারউদ্দিন চৌধুরীকে একাধিকবার কল দিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি।
তবে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল করিম বলেন, আমারা গত সপ্তাহে ইন্জিনিয়ারদের সাথে শহীদ মিনারের বিষয়ে আলোচনা করেছি। এটা প্রশাসনিক ভাবে যেমন সময় সাপেক্ষ তেমনি কার্যক্রমও সময় সাপেক্ষ।তবে অবহেলার বিষয়টি সত্য নয়। এটা কি করা যায় সেই অনুযায়ী বাজেট আসলে কাজ শুরু হবে।
উল্লেখ্য,২০০১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বর্তমান শহীদ মিনারটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সেই বছর সেপ্টেম্বর মাসে প্রায় ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে এই শহীদ মিনার নির্মাণ হয়। শহীদ মিনারটির নকশা ও নির্মাতা স্থপতি মহিউদ্দিন খান।


