হিমেল হান্নান, শাবিপ্রবি:
মা—মাত্র এক অক্ষরের এই ছোট্ট শব্দটির মধ্যে লুকিয়ে আছে অপরিসীম ভালোবাসা, ত্যাগ, মমতা ও নিঃস্বার্থ আত্মদান। পৃথিবীতে একটি শিশুর জন্মের পর মায়ের কোলই হয় তার প্রথম ও সবচেয়ে নিরাপদ ঠিকানা। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই চিরচেনা কোল থেকে দূরে সরে গেলেও, স্মৃতির পাতায় চিরকাল জেগে থাকে মায়ের স্নেহমাখা মুখ, যত্ন আর অপরিমেয় ভালোবাসা।
ব্যস্ততার মাঝেও মায়ের নম্বর থেকে আসা একটা কল যেন সব দুঃখ-কষ্ট মুছে দেয়। কথা শেষ করে একটা নিশ্বাস ফেললেই মনে হয়, পৃথিবীতে যেন স্বর্গীয় সুখ নেমে এসেছে। প্রতি বছর আন্তর্জাতিক মা দিবসে বিশ্বজুড়ে মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানানো হয় বটে, কিন্তু মায়ের অবদান কোনো একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
একজন সন্তানের জীবনে মা-ই প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু এবং সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণার উৎস। যাঁর কাছে মন খুলে যা খুশি বলা যায়, অভিমান, রাগ, ভালোবাসা, সবকিছু। চারদিকে যখন অন্ধকারে ঢেকে যায়, বিশ্বাস করা মানুষগুলো যখন হারিয়ে যায়, স্বার্থপরতা ও বিশ্বাসঘাতকতা যখন চরমে ওঠে, তখন নিঃস্বার্থে একমাত্র ভরসা ও ঢাল হয়ে দাঁড়ান তিনি। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বটবৃক্ষের মতো অবিচল ছায়া হয়ে সন্তানকে আগলে রাখেন।
টমাস আলভা এডিসনকে স্কুল থেকে পড়াশোনায় দুর্বল বলে বের করে দেওয়া হলেও, তাঁর মায়ের বুদ্ধিমত্তায় একটি মিথ্যা কথার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী। শুধু এডিসন নয়, প্রত্যেক সন্তানের জীবনেই মায়ের অবদান অপরিসীম। বাড়িতে যত মানুষই থাকুক, মা না থাকলে পুরো বাড়িটাই ফাঁকা ফাঁকা লাগে। যে ঘরে মা নেই, সে ঘরে ভালোবাসার পরশ থাকে না। যার মা নেই, শুধু সেই-ই তার মর্ম বোঝে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে অনেকে প্রথমবারের মতো মায়ের কোলছাড়া হয়েছেন। কারও কারও মা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। তাদের কয়েকজনের অনুভূতি জানতে চাইলে তারা বলেছেন,“বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বুঝতে পেরেছি মা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আগে হয়তো এতটা উপলব্ধি করতে পারিনি। এখন দূরে থেকে মায়ের ছোট ছোট যত্নগুলো খুব বেশি মনে পড়ে। মা শুধু একজন ব্যক্তি নন, বরং এক অপূর্ব অনুভূতি—যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নিরাপত্তা, বিশ্বাস ও নিঃশর্ত ভালোবাসা।”
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কাজী আতাহার উদ্দিন বলেন, “বাসা থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে প্রতিদিনই মায়ের শূন্যতা অনুভব করি। অসুস্থতায় মায়ের নির্ঘুম রাত জাগা, অভিমান ভাঙিয়ে খাইয়ে দেওয়ার স্মৃতিগুলো বারবার মনে পড়ে। এখন আর কেউ খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করে না। শুধু রাতে মায়ের ফোন আসে। মাকে চিন্তামুক্ত রাখতে খারাপ থাকলেও বলতে হয়, ‘ভালো আছি’। আমার কাছে প্রতিটি দিনই মা দিবস। মায়ের ভালোবাসা সত্যিই অমূল্য।”
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন,“মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ, নিঃশব্দ অথচ সবচেয়ে গভীর। আমার প্রতিটি সফলতার পেছনে আছে তাঁর দোয়া আর ত্যাগ। তিনি পাশে থাকলে অসম্ভবও সহজ মনে হয়। আমার হৃদয়ের সবচেয়ে শান্ত জায়গা তিনিই।পৃথিবীর সব ভালোবাসার চেয়ে তাঁর ভালোবাসা অনেক বড়। অনেকবার বলতে ইচ্ছে হয়—তুমি সুন্দর, তুমি শান্তি, তুমি শক্তি, তুমি ভরসা, তুমি ভালোবাসা। কিন্তু কখনো বলা হয়নি। জানি না, আর কখনো বলা হবে কি না।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মা হারা এক শিক্ষার্থী বলেন, “সবার পরিবার থেকে ফোন আসার গল্প শুনলে নিজের ভেতর এক অসহ্য হাহাকার তৈরি হয়। কোনো সাফল্যে প্রথমেই মায়ের কথা মনে পড়ে, কিন্তু তাঁকে আর পাওয়া যায় না। অসুস্থ হলে মায়ের হাতের ছোঁয়া আর সেবার অভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়, যা কেউ পূরণ করতে পারে না। ছুটিতে বাসায় গেলেও শান্তি পাওয়া যায় না, সবসময় মনে হয় কী যেন একটা নেই। তাই এখন আর তেমন বাসায় যাই না। শূন্যতা নিয়েই বেঁচে আছি। বাইরের মানুষের কাছে প্রকাশ না করলেও, বুকের ভেতর একটা চাপা কষ্ট সবসময় থেকে যায়।”
আন্তর্জাতিক মা দিবসে শিক্ষার্থীদের এই আবেগ, উপলব্ধি ও প্রত্যাশা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের জন্য কোনো বিশেষ দিনের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধাবোধের।
একদিন হয়তো মায়ের নম্বর থেকে কল আসা বন্ধ হয়ে যাবে, ‘মা’ ডাকের মধুরতা আর পাওয়া যাবে না। ভালো থাকুক পৃথিবীর সব মা। মা ও সন্তানের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হোক। বিলীন হয়ে যাক সব বৃদ্ধাশ্রম।
