নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ:
আজ আন্তজার্তিক নারী দিবস। চা বাগানের নারীদের জীবন মূলত সংগ্রাম, বঞ্চনা ও কঠোর পরিশ্রমের। বৈদেশিক মুর্দ্রা অর্জনের প্রধান চা শিল্পে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর একটি বিরাট অংশ রয়েছে বেকার। বেকারত্বের জীবনে নারীদের একটি বড় অংশ। জীবিকার তাগিদে চা বাগানের এসব বেকার নারীরা বস্তি এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। ঝুঁকি নিয়েই বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন, ইট-বালু-পাথর বহন, মাটি কাটার মতো কায়িক শ্রমে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করছেন। পুরুষদের সমান পরিমাণ কাজ করলেও তাদের মজুরি তুলনামূলক রয়েছে কম।
কমলগঞ্জের দেওছড়া ও কানিহাটি চা বাগনের গীতা রবিদাস ও রুকমনিয়া মৃধা বলেন, নারী দিবসের কথা আমাদের অনেকেই জানেন না। এই দিবসে কি হয় তা আমরা জানি না। এই দিনে তো আমাদের কোন ছুটি নেই। দিবস আসলেও আমাদের জীবনের বঞ্চনা ও কঠোর পরিশ্রমের গল্প তো আর শেষ হয় না।:
অনুসন্ধানে জানা যায়, চা বাগানে কর্মরত নারী ও পুরুষ শ্রমিকদের মধ্যে দৈনিক সর্বোচ্চ ১৮৭ টাকা মজুরিতে কাজ করছেন। ‘এ’ ক্লাস বাগানে দৈনিক ১৮৭ দশমিক ৪৩ টাকা এবং ‘বি’ ও ‘সি’ ক্লাসে যথাক্রমে ১৮৬ দশমিক ৩২ এবং ১৮৫ দশমিক ২২ টাকা। বাংলাদেশে শিল্প সেক্টরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম মজুরি পেয়ে থাকেন চা-শ্রমিকরা। সরকারের নিম্নতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত ৪৩টি সেক্টরে এবং মজুরি কমিশন ঘোষিত রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প সেক্টরের মজুরির সাথে তুলনা করলে চা-শ্রমিকদের মজুরি কম। স্বল্প এই মজুরি দিয়ে পাঁচ, সাত সদস্যের শ্রমিক পরিবারের ভরন পোষন চালিয়ে যাওয়া খুবই কঠিন। ফলে বাধ্য হয়ে বেকার নারীরা কাজের সন্ধানে বস্তিতে চলে আসেন।
রোদ, বৃষ্টিতে ভিজে চা বাগানে পোকা-মাকড়ের আক্রমনের মধ্যেই চলে তাদের কাজ। এরপর মজুরি পরিবারে প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। বেকার নারী শ্রমিকরা চা বাগানে কাজ না পেয়ে সংসারের চাকা সচল রাখতে বস্তি ও শহরে বেঁচে নিয়েছেন কঠিন কাজ। চা বাগানের পার্শ্ববর্তী এলাকায় বেকার নারী চা শ্রমিকদের এরকম কঠিন কাজের চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে।
শমশেরনগর চা বাগানের নারী শ্রমিক মনি চাষা, দেওছড়া বাগানের চানো রবিদাস, শান্তি রবিদাস জানান, বেকারত্বের জীবনে স্বামী ও সন্তানাদি নিয়ে বেঁচে থাকার প্রয়োজনে বাগানের বাইরে গিয়ে কায়িক কাজ করতে হয়। কেউ বিল্ডিং কনস্ট্রাকশনে মাথায় টুকরি নিয়ে ইট, বালু ও পাথর বহন করেন। কেউ কেউ মাটি কাটার কাজে নিয়োজিত থাকেন। কেউ কেউ নার্সারী সমুহে কাজ করেন। নারীদের জন্য এই কাজগুলো খুবই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও সংসারের হাল ধরতে বাধ্য হয়েই পুরুষদের সমান কাজ করতে হয়। তবে মজুরি পুরুষদের চেয়ে দেড়, দুশো’ টাকা কম থাকে।
শমশেরনগর কানিহাটি চা বাগানের রুকমিনিয়া মৃধা, রুপালী রিকিয়াশন ও গনেশিয়া রবিদাস জানান, বাগানে কাজ না থাকায় বস্তিতে একটি নার্সারীতে কাজ করে চলেন। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত মাঝখানে একঘন্টা বিরতি দিয়ে কাজ করি। আমরা নারীদের দৈনিক মজুরি ১৬০ টাকা আর পুরুষরা পান ২৫০ টাকা।
আলীনগরের সুনছড়া চা বাগানের নারী কুন্তি রবিদাস ও গীতা হাজরা জানান, বস্তিতে গিয়ে সারাদিন মাটি কাটা ও মাটি বহন করার কাজ করে করে দৈনিক ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পাই। এই আয়ে কোনমতে সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে।
মৌলভীবাজার চা শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক হরিনারায়ন হাজরা বলেন, চা বাগানের শ্রমিকদের এমনিতেই পুষ্টিকর খাদ্যের অভাবে চেহারায় হাড্ডিসার দশা। তার উপরে বাগানের বেকার নারী শ্রমিকদের একটি অংশ বাইরের বস্তিতে মাটি কাটা, নার্সারী, কনস্ট্রাকশনসহ বিভিন্ন কষ্টসাধ্য কাজে নিয়োজিত। রোগশোকে জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে কঠিন কাজ করার পরও কাঙ্খিত মজুরি পান না। সরকারি উদ্যোগে চা বাগানের বেকার নারীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানান তিনি।
কানিহাটি চা বাগানের শ্রমিক নেতা সীতারাম বীন বলেন, বিল্ডিং আর কনস্ট্রাকশনের কাজে কম মজুরিতে সহজেই চা বাগানের নারীদের পাওয়া যাচ্ছে। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত কাজ করে রোজ ২০০ থেকে ৩০০ টাকা উপার্জন হয়। দৈনিক এই আয় দিয়েই কোন মতে দু:খ-কষ্টে খাবার-দাবার ও বাচ্চাদের পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছেন। এরপর বাসস্থান, স্যানিটেশন, পানীয়জল আর চিকিৎসা সমস্যা তো আছেই। বেকার নারী ও যুবতিদের কর্মসংস্থানে সরকারিভাবে উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন।


