লুৎফুর রহমান শাওন, ছাতকঃ
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় বোরো মৌসুমে হাওর-বিলসহ ফসলি জমিতে ধান চাষাবাদ এখন শেষ পর্যায়ে। গত দুই বছর বড় কোনো বন্যা না হওয়ায় বোরো ধানে বাম্পার ফলন পেয়েছেন কৃষকরা। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবারও বেশ উৎসাহ ও ফুরফুরে মেজাজে মাঠে নেমেছেন কৃষক-কৃষানীরা।
ইতোমধ্যে উপজেলার হাওর এলাকায় হাইব্রিড জাতের ধান রোপণের কাজ শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। তবে হাওরের বাইরে অন্যান্য এলাকায় এখনো প্রায় ৫৫ শতাংশ জমিতে ধানের চারা রোপণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে কয়েকটি হাওরে সেচ ও পানির সংকট দেখা দেওয়ায় বোরো আবাদ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অনেক কৃষক। যদিও কিছু এলাকায় স্যালো ইঞ্জিনচালিত পাম্পের মাধ্যমে জমিতে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত ছাতক উপজেলায় মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৩৪ হাজার ৫৫৩ একর। চলতি বোরো মৌসুমে ১৪ হাজার ৯৯২ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ১৫ ডিসেম্বর থেকে বোরো ধানের রোপণ শুরু হয় এবং জানুয়ারি মাসের শেষ দিকে রোপণ কার্যক্রম শেষ হবে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
মঙ্গলবার পর্যন্ত উপজেলায় ৯ হাজার ৫১২ হেক্টর জমিতে ধান রোপণ সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে হাওর এলাকায় হাইব্রিড জাতের ধান রোপণ হয়েছে ৩৪৬ হেক্টর, উপশী জাত ২ হাজার ৯৭১ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ধান ৬৫ হেক্টর জমিতে। সব মিলিয়ে হাওর এলাকায় ধান রোপণ শতভাগ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, হাওরের বাইরে এলাকায় হাইব্রিড ধান রোপণ হয়েছে ২ হাজার ১৮০ হেক্টর এবং উপশী জাতের ধান রোপণ হয়েছে ৩ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে।
কৃষি বিভাগ বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় বোরো চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করেছে। পাশাপাশি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের ১ হাজার কৃষককে হাইব্রিড ধানের বীজ এবং ১ হাজার ৪শ’ কৃষককে উপশী জাতের ধানের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। এছাড়া প্রত্যেক কৃষককে জনপ্রতি ২০ কেজি করে সার সরকারি প্রণোদনা ও পুনর্বাসন কর্মসূচির আওতায় দেওয়া হয়েছে।
সরেজমিনে হাওর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কনকনে শীত উপেক্ষা করে কাকডাকা ভোরেই কৃষকরা কৃষি সরঞ্জাম হাতে মাঠে ছুটে যাচ্ছেন। কেউ কাদামাখা জমি থেকে চারা তুলছেন, কেউ পাওয়ার টিলার বা বলদের সাহায্যে জমি প্রস্তুত করছেন। প্রস্তুত জমিতে দলবেঁধে চলছে ধানের চারা রোপণ। রাসায়নিক সার প্রয়োগসহ সোনালি ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা।
তবে এবছর বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় অনেক হাওর ও বিলে পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে বেশ কয়েকটি এলাকায় সেচের জন্য তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। কিছু এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সেচ ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি।
জাউয়াবাজার ইউনিয়নের বড় কাপন গ্রামের কৃষক ফখর উদ্দিন জানান, সোনাডুবি (ইন্দারবন) এলাকায় তিনি ১০ একর জমিতে বোরো ধানের চারা রোপণ করেছেন। ছেলে নুর হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে ইতোমধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ জমিতে চারা রোপণের কাজ শেষ হয়েছে। তবে পানির সংকটের কারণে কাজ কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে।
ইসলামপুর ইউনিয়নের মোল্লাপাড়া গ্রামের কৃষক কুটি মিয়া বলেন, তিনি ১৩ একর জমিতে বোরো আবাদ করেছেন এবং সরকারি প্রণোদনায় বিনামূল্যে কিছু হাইব্রিড ধানের বীজ পেয়েছেন। পানির সংকট মোকাবেলায় পাম্প মেশিনের মাধ্যমে সেচ দেওয়া হচ্ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।
নোয়ারাই ইউনিয়নের লক্ষীবাউর গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের জানান, তিনি ২০ একর জমিতে হীরা ও ২৮/২৯ জাতের ধান রোপণের কাজ শেষ করেছেন। তবে সঠিক সময়ে পর্যাপ্ত সেচ দিতে পারা নিয়ে কিছুটা দুশ্চিন্তা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হোসেন খান বলেন, গত দুই বছর বড় বন্যা না হওয়ায় কৃষকরা আশানুরূপ ফলন পেয়েছেন। ফলে বোরো চাষের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বোরো ধান আবাদে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আমরা আশাবাদী। কৃষি উৎপাদন আরও বাড়াতে শিক্ষিত যুবসমাজকে কৃষিতে এগিয়ে আসতে হবে।
