কুহিনূর রহমান নাহিদ, শান্তিগঞ্জ:
শান্তিগঞ্জ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর এক-তৃতীয়াংশে প্রধান শিক্ষক নেই। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মনোবলেও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।

শূন্য পদে প্রশাসনিক জটিলতা
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ৯৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩১টিতে প্রধান শিক্ষক পদ শূন্য। এসব বিদ্যালয়ে সিনিয়র সহকারী শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এছাড়া ৪৮৩ জন সহকারী শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন ৩৬৭ জন। অর্থাৎ ১১৬টি পদ শূন্য। এর মধ্যে ১৮ জন শিক্ষক ছুটিতে আছেন, বেশির ভাগই চিকিৎসা ও মাতৃত্বজনিত কারণে। ফলে প্রায় সব বিদ্যালয়েই শিক্ষক সংকট দেখা দিয়েছে।
শিক্ষক সংকট
শিক্ষক সংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে দু’একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির পাঠদানের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। এতে শিক্ষকেরা পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না, ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পশ্চিম বীরগাঁওয়ের দুর্বাকান্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে আছেন মাত্র একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। একই ইউনিয়নের উমেদনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচটি পদের বিপরীতে দায়িত্বে আছেন একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। শিমুলবাক ইউনিয়নের রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ছয়জনের স্থলে আছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ দুইজন। এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান চালাতে ডেপুটেশনের মাধ্যমে শিক্ষক সংযুক্ত করা হচ্ছে।
ভারপ্রাপ্তদের সীমাবদ্ধতা
রঘুনাথপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুরনজিত কুমার দাস বলেন, “প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের সব প্রশাসনিক দায়িত্ব একাই সামলাতে হয়। এতে ক্লাস নেওয়ার সময় কমে আসে। শূন্যপদ দ্রুত পূরণ হলে প্রশাসনিক কাজ ও পাঠদান দুটিই স্বাভাবিক হবে। প্রধান শিক্ষকের উপস্থিতি শুধু প্রশাসনিক সহায়তা নয়, বিদ্যালয়ে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও শিক্ষার মান ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।”
অভিভাবকের দাবি
পাগলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক নুরে আলম সিদ্দিকী রিচার্ড বলেন, “বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক থাকলে শিক্ষার পরিবেশ অনেক বেশি সুশৃঙ্খল থাকে। শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে কাজ করছেন, কিন্তু নেতৃত্বের অভাবে ক্লাস পরিচালনা ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া গেলে শিক্ষার মান যেমন বাড়বে, তেমনি শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহও বৃদ্ধি পাবে।”
প্রশাসনের বক্তব্য
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেলিম খান বলেন, “প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক পদে শূন্যতা দীর্ঘদিনের সমস্যা। প্রতিবছর অবসর ও বদলির কারণে পদ খালি হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হওয়ায় নতুন শিক্ষক যোগ দিতে দেরি হয়। যেসব বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক আছেন, সেখান থেকে অন্য স্কুলে সাময়িক সংযুক্তি দিয়ে পাঠদান চালানো হচ্ছে। নতুন নিয়োগ সম্পন্ন হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে।”
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুকান্ত সাহা বলেন, ” শিক্ষার মানোন্নয়ন আমাদের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে। উপজেলা প্রশাসন নিয়মিতভাবে বিদ্যালয়গুলো পর্যবেক্ষণ করছে এবং শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখতে নানামুখী পদক্ষেপ নিচ্ছে। গত জুনে আমাদের উদ্যোগে উপজেলার সব বিদ্যালয়ে ‘বেসিক নলেজ টেস্ট’ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর অক্টোবরে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ‘মেধা যাচাই পরীক্ষা’ নেওয়া হয়েছে। ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শিক্ষক সংকট ও নেতৃত্বের ঘাটতি শিক্ষার মানে প্রভাব ফেলছে। আমরা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করছি, যাতে দ্রুত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদগুলো পূরণ হয়।”
