নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ:
আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। তবে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে অপার লীলাভূমি মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলায় পর্যটনের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ স্থিমিত বলেই পরিলক্ষিত হচ্ছে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে উপজেলার পাহাড়ি টিলা ও টিলার পাদদেশে হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, গেস্ট হাউজসহ অসংখ্য স্থাপনা তৈরি হয়েছে। পাহাড়, টিলা, বনাঞ্চল ও চা বাগান অধ্যুষিত উপজেলায় মনিপুরীসহ অসংখ্য ভাষাভাষীর লোক রয়েছে। ফলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় যথাযথ উদ্যোগ নিলে উপজেলা পর্যটনের নতুন দ্বার উম্মোচিত হবে।
জানা যায়, ৪৮৫.২৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের কমলগঞ্জ উপজেলা প্রকৃতির অপার লীলাভূমি সবুজায়নে ভরপুর। কুরমা বনবিটের অধীনে হামহাম জলপ্রপাত, মণিপুরী গ্রাম, ক্যামেলিয়া লেক ও হাসপাতাল, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবপুর লেক, বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ, ডবলছড়া খাসিয়া পুঞ্জি, বন্যপ্রাণী অভয়ারন্য রাজকান্দি বনরেঞ্জ, মনিপুরী ললিতকলা একাডেমী, শমশেরনগর বিমান বন্দর, দু’শো বছরের প্রাচীন ছয়সিড়ি দিঘী, পর্যটন উপযোগী উচুঁ-নিচু নয়নাভিরাম চা বাগান, ধলাই-লাঘাটা, খিরনী নদীসহ অর্ধশতাধিক পাহাড়ি ছড়া, মণিপুরী পাড়ায় পাড়ায় কুঁটির শিল্প বিশেষত: তাঁত শিল্প সমৃদ্ধ এলাকা।

ভূ-প্রকৃতি ও ভৌগলিক অবস্থান ভেদে কমলগঞ্জ উপজেলার বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির জাতিভেদে মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতির ভিন্নতা রয়েছে। কমলগঞ্জের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি এ সমতল অঞ্চলে বসবাসরত স্বতন্ত্র স্বত্বার জনগোষ্ঠী খাসিয়া, মনিপুরী, ত্রিপুরী, টিপরা, গারো এদের বসবাস। এ ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন চা বাগানে বসবাসরত ক্ষৃদ্র নৃগোষ্ঠী। যাদের জীবনাচার, সংস্কৃতি ও ঐত্যিহ্যর কারণে কমলগঞ্জ দেশব্যাপী পরিচিত।
সরজমিনে দেখা যায়, সাপ্তাহিক বন্ধের দিনগুলোতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যরে রূপসজ্জা দেখতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কমলগঞ্জে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসু পর্যটকরা। আর এই ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের পদভারে মুখরিত হয়ে উঠে পর্যটন কেন্দ্রগুলো। শুধু দেশি পর্যটকই নয়, বিদেশি পর্যটকদেরও উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

উপজেলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তার জীবনধারা ও সংস্কৃতিসহ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এ জনপদ। বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান রয়েছে। বাংলাদেশের সাতটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও দশটি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে লাউয়াছড়া অন্যতম। এই বনের পরিচিতি শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি পর্যটন কেন্দ্র। চিরহরিৎ এ বনাঞ্চল বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের নিরাপদ আবাসস্থল।
এ উপজেলায় পাহাড়ি উঁচুনিচু টিলার উপর সবুজ চা বাগানবেষ্টিত, জাতীয় ফুল দুর্লভ বেগুনি শাপলার আধিপত্য পদ্মকন্যা মাধবপুর লেক। মাধবপুর লেকের পরেই একই রাস্তায় ১০ কিলোমিটার যাওয়ার পরই রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমান স্মৃতিসৌধ।

কমলগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে রাজকান্দি বন রেঞ্জের কুরমা বনবিট এলাকার ১০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে দৃষ্টিনন্দন হামহাম জলপ্রপাত। স্থানীয় পাহাড়ি অধিবাসীরা এ জলপ্রপাতের ধ্বনিকে হামহাম বলে। এ বনের ভেতরেই রয়েছে সম্প্রতি আবিষ্কৃত ফিকল ঝরনা। আদমপুর ও মাধবপুরে মনিপুরী পল্লীগুলোতে পর্যটকদের দেখার মতো সুন্দর সুব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া প্রতিটি চা বাগানের পাহাড়ি লেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যকে বাড়িয়ে তুলেছে।
লাউয়াছড়ায় আগত পর্যটক মাহফুজুর রহমান, লুৎফুন্নাহার বেগম ও মার্জিয়া সুলতানা বলেন, চা বাগান লেক, জলপ্রপাতসহ অন্যান্য পাহাড়ি এলাকা দেখতে আরো সুন্দর সুব্যবস্থা প্রয়োজন। যাতে সন্তানদের নিয়ে প্রাকৃতিক এসব দৃশ্য অবলোকন করা যায়।
কমলগঞ্জের লেখক, গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, ‘প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশসহ এখানে বিভিন্ন জাতিসত্তার ভাষাভাষি ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন রয়েছে। তাই পুরো কমলগঞ্জ উপজেলাকে দেখা হলে অর্ধেক বাংলাদেশকেই দেখা হয়ে যাবে।’
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর বলেন, উপজেলার খাসিয়া পুঞ্জিতে গৃহ নির্মাণ, মাধবপুর লেক উন্নয়ন, হামহাম জলপ্রপাতে যাওয়ার সুন্দর সুব্যবস্থার জন্য মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মহোদয় আমাদের কাছ থেকে প্রস্তাবনা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব প্রেরন করেছেন। বরাদ্দ আসলেই পর্যটন উন্নয়নে কাজ হবে।


