*কমলগঞ্জে চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে বরাদ্দকৃত টাকা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ
*তালিকায় একই পরিবারের চার, পাঁচজন উপকারভোগী!
নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ:
“তালিকায় আমার নাম ও ভোটার আইডি নাম্বার ঠিক আছে। তবে টাকা আমি পাইলাম না। আমার টাকা পঞ্চায়েত সম্পাদকের ছেলের বিকাশে চলে গেছে। বিকাশ নাম্বার আমার নয়। আমি মেম্বাররে কইলাম, আমার টাকা পাইলাম না।” কথাগুলো বলছিলেন কমলগঞ্জের শমশেরনগর চা বাগানের বড়লাইনের
মিক রামাকান্ত যাদব।
সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, সমাজসেবা অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় জনপ্রতি ৬ হাজার টাকা হারে প্রদান করা হয়েছে। কমলগঞ্জ উপজেলার ২২টি চা বাগানে ৭ হাজার উপকারভোগী শ্রমিকের নামে এই টাকা বিকাশে আসে। এর পূর্বে বাগান পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ শ্রমিকদের ভোটার আইডি কার্ডের কপি ও বিকাশ নাম্বার তালিকাভূক্ত করে সমাজসেবা অফিসে জমা দেন। তালিকায় কেউ কেউ তাদের নিজেদের পরিবারের স্বামী, স্ত্রী, সন্তান, ভাই, বোনের নাম ও বিকাশ নাম্বারে টাকা তুলেছেন। একই পরিবারের চার, পাঁচজনের নামে বিকাশে এসেছে টাকা। আবার অনেক নিরীহ চা শ্রমিক পরিবার সদস্যের নাম ও বিকাশ নাম্বার দেয়ার পরও টাকা পাননি। চা শ্রমিকদের জীবন মান উন্নয়নের এই টাকা বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ তুলে শ্রমিকরা সোমবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
শমশেরনগর বাগানের শ্রমিক নেতা গোপাল কানু শ্রীকান্তের বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের বিষয়ে কমলগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বাগানের নারী শ্রমিক সবিতা রেলী। শমশেরনগর বাগানের শ্রমিক পারতালি তেলেঙ্গা, আদমটিলার শ্রমিক দুলাল শীল, রবিদাস টিলার প্রিতী পাল বলেন, আমাদের নাম, আইডি ও বিকাশ নাম্বার নিয়ে তালিকায় নাম দেয়া হয়েছে। এরপরও আমরা কোনো টাকা পাইনি।
বাগানের ভজনটিলার শ্রমিক শিমুল লোহার বলেন, ‘অন্যের নামে আমার বিকাশে টাকা আসে। পরে আমার পাশের বাড়ির বাসিন্দা জয়প্রকাশ রাজভর এসে আমার মোবাইল নিয়ে টাকা তুলে আমাকে ২ হাজার দিয়ে বাকি টাকা সে নিয়ে গেছে।’ বড় লাইনের বাসিন্দা ছবি লোহার জানান, আমার আইডি ও নাম দিয়ে নির্মল ছত্রির বিকাশে ৬ হাজার টাকা আসে। আমার বিকাশে টাকা আসেনি। এটি জানার ১৫ দিন পরে নির্মল ছত্রী আমাকে ৪ হাজার টাকা দিয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, উপকারভোগী তালিকায় শমশেরনগর চা বাগানের শ্রমিক নেতা নির্মল দাস পাইনকা তার নিজের নামে, স্ত্রী’র নামে, বড় মেয়ে, ছোট মেয়ে ও ভাইয়ের স্ত্রী মিরা বাঈ পাইনকার নাম তালিকায় দিয়ে বিকাশে টাকা তুলেছেন। একইভাবে শমশেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েত সম্পাদক শ্রীকান্ত কানু গোপাল, স্ত্রী রিনা কানু, ভাই হৃদয় প্রকাশ গুপ্তা, ভাইয়ের বউ শিপা কানু, বোন হেমন্তি কানুর নাম ও বিকাশ নাম্বার রয়েছে। এছাড়াও চা শ্রমিক নেতা সুরনারায়ন রেলী সরাইয়ার পরিবারের ১ম স্ত্রী, ২য় স্ত্রী থেকে শুরু করে তালিকায় ৭ জনের নাম ও বিকাশ নাম্বার পাওয়া যায়।
এব্যাপারে মনু-ধলই ভ্যালী কমিটির সম্পাদক নির্মল দাস পাইনকা বলেন, ‘আমার জীবনে এভাবে কখনো হয়নি। তবে অসুস্থতায় চিকিৎসার কথা বলেছিলাম, তাই পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ আমার পরিবারের তালিকা দিয়েছে। এজন্য আমি খুবই দু:খিত।’
শমশেরনগর চা বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সম্পাদক শ্রীকান্ত কানু গোপাল বলেন, ‘তালিকা দিয়েছেন অনেকেই। যে যেভাবে তালিকা দিয়েছে, সেভাবে টাকা এসেছে। আমার ছেলের বিকাশে যার টাকা আসছে, সে-ই আমার ছেলের নাম্বার দিয়েছে। আমার পরিবারে দু’জনের নামে টাকা এসেছে। ভাইয়েরা তো আলাদা পরিবার। তারাও তো প্রাপ্য।’ সুরনারায়ন রেলী বলেন, আমার পরিবারে শুধু আমার স্ত্রী ও ছেলের বিকাশে টাকা এসেছে।
এব্যাপারে শমশেরনগর চা বাগান ব্যবস্থাপক জাকির হোসেনের মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ বিষয়ে কমলগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার ইউসুফ মিয়া বলেন, অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
এব্যাপারে কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাখন চন্দ্র সূত্রধর শমশেরনগর, কুরমাসহ কয়েকটি বাগান শ্রমিকদের অভিযোগ প্রাপ্তির সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এরকম কিছু ঘটতে পারে বলে আগেই আমি বারবার সতর্ক করেছি। সমাজসেবা অফিসারকে বিষয়টি জানিয়েছি তালিকা যাচাই বাছাই করার জন্য। এবিষয়ে তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


