নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ:
আকাশমনি, ম্যানজিয়াম, রাবার, ইউক্যালিপটার্সসহ বিভিন্ন ধরণের বিদেশী প্রজাতির গাছ আগ্রাসী প্রজাতি হিসাবে খ্যাত। এসব গাছের কাঠ ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও দ্রুত বর্ধনশীল হিসাবে পরিগণিত হয়েছে।
ফলে রাস্তার ধারে, বনের টিলায়, কৃত্রিম বনায়নে কম সময়ে অধিক মুনাফার আশায় বনায়নের হিড়িক শুরু হয়। মৌলভীবাজার জেলার বিভিন্ন সামাজিক ও কৃত্রিম বনায়নে, বাড়িঘরের আশপাশে রোপিত এসব গাছের কারনে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি গুণতে হয়েছে কৃষি ও প্রাণবৈচিত্র্যকে। পরিবেশের বড় অবক্ষয়ের পর ব্যাপক চাহিদা সম্পন্ন আকাশিয়া ও ইউক্যালিপটাস গাছের চারা রোপন, উত্তোলন ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত কয়েক যুগ ধরে বিদেশী প্রজাতির দ্রুত বর্ধনশীল এসব গাছ দিয়ে বনায়নের হিড়িক শুরু হয়। সিলেট অঞ্চলের সংরক্ষিত বনাঞ্চল, রাস্তার ধারে সামাজিক বনায়ন এবং ব্যক্তি উদ্যোগে রোপিত আগ্রাসী প্রজাতির এসব বিদেশী গাছের কৃত্রিম বনায়ন সমূহ শোভা পাচ্ছে। এতে কৃষি, মৎস্য চাষাবাদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে। গাছগুলো পশুপাখির খাদ্য তৈরি না হওয়ায় পরিবেশেরও ক্ষতি করেছে। ফলে দেশীয় প্রজাতির মুল্যবান কাঠ ও ফলের গাছ এবং ঔষধি বৃক্ষের চাষাবাদ উৎপাদনের ও সংরক্ষনের বিষয়টি প্রায় উপেক্ষিত হয়ে আছে। আগ্রাসী প্রজাতির এসব গাছ গাছালি কৃষি চাষাবাদে ব্যাপক ক্ষতি বয়ে আনছে। রাস্তার পাশে সামাজিক বনের গাছের ছায়ায় পড়ে ধান গাছে রোগ ও পোকার আক্রমন মারাত্মক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যায়ক্রমে জমিতে ধান গাছ মারা যাচ্ছে।
কমলগঞ্জের শিক্ষক জমসেদ আলী, কৃষক মোবাশ্বির আলী, সমাজকর্মী তোয়াবুর রহমান বলেন, আকাশমনি, ম্যানজিয়াম এসব গাছ গাছালি চাষাবাদে কৃষিজমিতে চাষাবাদ বিনষ্ট হয়েছে। মৎস্য চাষাবাদেও ক্ষতির কারন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাছের ছায়ায় ধানী জমির জায়গা দখল করে। চাষাবাদকৃত ধান গাছ কেটে গরু মহিষকে খাওয়ানো ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। কৃষকরা বলেন, আকাশি গাছের ছায়ায় ধান থেকে শুরু করে কোন ধরনের চাষাবাদ সম্ভব হয় না। একইভাবে মৎস্য খামারের পাশে এইসব গাছের কারনে মৎস্য চাষাবাদেও ক্ষতির কারন হয়ে দেখা দিয়েছে। এতোদিনে পরিবেশ ও প্রতিবেশের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। আরো আগে এসব গাছের চারা উৎপাদন, বিক্রয় ও বনায়ন নিষিদ্ধ করা উচিত ছিল।
গবেষকদের মতে, এ গাছগুলো স্থানীয় প্রজাতিদের জায়গা দখল করে সেগুলোকে বিপন্ন করে তোলে। গাছপালা বা পশুপাখির যেকোনো প্রজাতি ভিন্ন পরিবেশ থেকে এনে বিস্তার ঘটাতে দিলে কালক্রমে তা হয়ে ওঠে আগ্রাসী প্রজাতি।
মৌলভীবাজারের বন্যপ্রাণি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, আগ্রাসী প্রজাতির গাছগাছালি পশু পাখির খাবার তৈরি করে না এবং ব্যাপক বিস্তারে অন্য গাছগুলোর সালোকসংশ্লেষণ-প্রক্রিয়া ব্যাহত করে। যে কারনে জীববৈচিত্র্যের জন্য আগ্রাসী প্রজাতির গাছ খুবই ক্ষতিকর। বর্তমানে আকাশমনি ও ইউক্যালিপটাস গাছ নিষিদ্ধ ঘোষণা হলেও এতোদিনে পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতির সৃষ্টি করেছে। এতে দেশীয় প্রজাতির অনেক গাছগাছালি হুমকির মুখে পড়েছে।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের প্রাক্তন উপ-পরিচালক মো. শামসুদ্দীন আহমদ জানান, আকাশি, ইউক্যালিপটার্স গাছের ছায়ায় ধান গাছের পাতা মোড়ানো রোগসহ বিভিন্ন ছত্রাকে আক্রান্ত করে। এসব রোগের আক্রমন থেকে রক্ষার জন্য কীটনাশক অথবা বালাইনাশক ব্যবহারে কৃষকদের পরামর্শ দেয়া হয়। তিনি আরও বলেন, আকাশি গাছের পাতা ঘন, এমনকি সূর্যের আলো মোটেও পড়ে না। এগুলো প্রকৃতির জন্য ক্ষতিকর। গাছের পাতা পড়ে কৃষিক্ষেত বিনষ্ট হয়। ক্ষতিকর এসকল গাছ রোপন থেকে সবাইকে নিরুৎসাহিত হওয়ার জন্য পূর্বেও বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে গাছের উৎপাদন ও বিক্রয় বন্ধ হওয়ায় সার্বিকভাবে উপকার বয়ে আনবে।


