আহমদে সবুজ
সিলেট মহানগর হকার্স ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সভাপতি রকিব আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের যেনো শেষ নেই, দোকান কোঠা দেওয়ার নামে টাকা আদায়ের অভিযোগ তো আছেই, একে একে মিলছে আরো অভিযোগ, যেখানে সাধারণ ব্যবসায়ী পাচ্ছেন না একটি দোকান, সেখানে নামে বেনামে অসংখ্য দোকান রয়েছে রকিব আলী ও তার স্বজন-ঘনিষ্ঠদের দখলে।
লালদীঘিরপারের মাঠে ভাসমান ও দরিদ্র হকারদের জায়গা হওয়ার কথা থাকলেও এখানকার একচ্ছত্র অধিপতি রকিব আলী। বিশাল জায়গাজুড়ে গড়েছেন গরুর খামার-কসাইখানা, সেখানে মৃত গরুর মাংসও বিক্রি করছেন তিনি।
আধুনিক কাগজের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে রকিব আলীর অপরাধের নানা চিত্র। রকিব আলীকে সন্তুষ্ট না করলে ব্যবসা করা সম্ভব নয়। তাই প্রতিদিন হকার্স মার্কেটের সবজি দোকান ও মাছবাজারের ব্যবসায়ীরা ২০০ টাকা করে ‘নজরানা’ দেন রকিব আলীকে।
এ টাকা তুলেন রকিব আলীর দুই ‘খাস’ লোক রুম্মান ও সুমন। আবার এ দুজনকে বাড়তি খাতির করলে মিলে আরো বিশেষ সুবিধা। এমনকি হকার না হয়েও মিলে যায় দোকান। জানা গেছে, লালদিঘীরপারের মাঠের দোকান পেয়েছেন এক ব্যাংক কর্মকর্তাও।
যিনি মিডল্যান্ড ব্যাংকের শিবগঞ্জ উপ শাখায় কর্মরত আছেন।
অভিযোগ রয়েছে, লালদীঘিরপারের মাঠে প্রতি লাইনের প্রথম দোকানই নিজের দখলে রেখেছেন রকিব আলী। তাদের পছন্দের লোকেরাই জায়গা পেয়েছেন সবজি দোকান ও মাছবাজারের সামনের সারিতে।
হকার্স মার্কেটকে পরিচ্ছন্ন রাখতে মাছ ও সবজি দোকানগুলোর পেছনের দিকে থাকার কথা থাকলেও রকিব আলীকে ‘ম্যানেজ’ করে তারা জায়গা করে নিয়েছেন একেবারে সামনে। এজন্য ভোগান্তি পোহাচ্ছেন অন্য ব্যবসায়ীরা। মাছ ও সবজি দোকানের কারণে মার্কেটের প্রবেশমুখ সব সময় জল-কাদাময় থাকে। সেটি ডিঙিয়ে ক্রেতারা সচরাচর ভেতরে প্রবেশ করতে চান না।
সিলেট মহানগর হকারস ঐক্য কল্যাণ পরিষদের অর্থ সম্পাদক রফিক বলেন, এখানে প্রতিটা গলির সামনের দোকানগুলো রকিবের সহযোগী রুমনের দখলে। আমরা এই মাঠে এসে দেখতে পেয়েছি এই মাঠ পরিচলানা করছেন রকিব ও রুমন। এই সাহস তারা কোথায় পায়? তাদের জুলুমে আমরা আর এই মার্কেটে থাকতে পারছি না।
সিলেট মহানগর হকার্স ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সহসভাপতি জানে আলম বলেন, দোকান বাবদ আমি রুমনকে ৪হাজার টাকা দিয়েছি কিন্তু এখনো পর্যন্ত আমি কোন দোকান পাইনি। আমার দুঃখ হলো আমার মতো ব্যক্তি যদি দোকান না পাই তাহলে সাধারণ হকাররা কী করবে? তারা কোত্থেকে পাবে?
সিলেট মহানগর হকার্স ঐক্য কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খোকন ইসলাম বলেন, এখানে একটি দোকানের পরিমাণ সাড়ে চার হাত থেকে পাচ হাত। এখানে কিভাবে মাছের ফিশারি, গরুর খামার, মুরগির দোকান হবে? তাছাড়া, আগে হকারে কখনো মুরগির দোকান ছিলনা এখন কিভাবে আসলো সেটা আপনাদেরকে দেখতে হবে।
সরেজমিন দেখা গেছে, বড় পরিসর নিয়ে গড়েছেন নিজস্ব গরুর খামার, কসাইখানা। খামারে অন্তত ২০-২৫টি গরু রয়েছে আর কসাইখানায় প্রতিদিনই গরু জবাই করে বিক্রি করা হয়। আধুনিক কাগজের কাছে প্রমাণ রয়েছে এমনকি মৃত গরুর মাংসও বিক্রি হয় সেখানে।
গত ১১মে খামারের একটি গরু বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায়। সেই গরুটিও জবাই করে বিক্রি করেছেন রকিব আলী। মৃত গরু দিয়ে দুই দফা লাভ করেছেন রকিব আলী। মাংস বিক্রির টাকা তো পেয়েছেনই আবার যে ঘটনায় গরুটির মৃত্যু হয়েছে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণও নিয়েছেন ৮০ হাজার টাকা।
মরা গরু ‘জীবিত’ হওয়ার গল্প বললেন, সিলেট মহানগর হকার্স ঐক্য কল্যাণ পরিষদের যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক খলিল আহমদ। তিনি বলেন, মৃত গরু জবাইয়ের ঘটনার দিন আমি সন্ধ্যার পর মাঠে আসলে শুনি বিদ্যুতের লাইনের স্পর্শে একটু গরু মারা গিয়েছে। আমি গিয়ে দেখি দু’জন ইলেক্ট্রিশিয়ান কাজ করছে। আমি তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমরা যেভাবে কাজ করতেছো এভাবে এখন যদি গরু মারা না গিয়ে মানুষ মারা যেত এর দায়ভার কে নিবে? একথা বলে তাদেরকে গরুর কথা জিজ্ঞেস করি। তারা আমাকে গরু দেখিয়ে দিলে আমি গিয়ে দেখি গরুটি মারা গিয়েছে। কিন্তু রাত আনুমানিক সাড়ে ১০টার দিকে রকিব আলী ও রুমন মিলে মৃত গরুটিকে জীবিত বলে জবাই করে ফেলেন।
পরে আমি তাদেরকে বললাম, তোমরা মরা গরুটি কেন জবাই করলে? উত্তরে তারা বললেন, তুই কথা বলবিনা, এটা জীবিত। এটা জীবিত গরু এটা তুমি বুঝবে না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ীদের জন্য নির্মিত জলাধারকে রকিব আলী ব্যবহার করছেন মাছের ঘের হিসেবে। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের মাছের চাষ হয় সেখানে।
রকিব আলীর বাড়ি কোথায় তা সঠিক জানেন না হকাররা। কেউ জানেন সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কেউ জানেন ওসমানীনগরে, কেউ জানেন তার বাড়ি চাঁদপুরে। সিলেট প্রধান ডাকঘরের সামনে এক সময় পেঁয়াজ বিক্রি করতেন যে রকিব আলী আজ তার সিলেট নগরীতে দুটি বাড়ি।
একটি খুলিয়াটুলায়, অন্যটি নবাব রোডে।
প্রয়াত বদর উদ্দিন আহমদ কামরান যখন সিলেটের মেয়র তখন থেকে রকিব আলী নিজেকে হকার্স লীগের নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। অথচ একসময় রকিব আলী ছিলেন সিলেট মহানগর হকার্স দলের সাধারণ সম্পাদক।
সুবিধা নিতেই ভোল পাল্টান তিনি। আবার যখন বিএনপি নেতা আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র হন তখন তার কাছের মানুষ বনে যান রকিব আলী। আরিফুল হকের পর্ব শেষ হলে আবার তিনি আওয়ামী সুর তোলেন। পুরো দাপটেই মাঠে আছেন রকিব আলী। তার এ দাপটের শক্তি কোথায়? রকিব আলীর খুঁটির জোরই বা কোথায়?