শাবিপ্রবি প্রতিনিধি
দেশের উচ্চশিক্ষাকে যুগান্তকারী এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করে তুলতে নিরবচ্ছিন্ন গবেষণা, সৃজনশীল উদ্ভাবন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই চরম প্রতিযোগিতামূলক বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল প্রথাগত সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং এগুলোকে যুগান্তকারী জ্ঞান সৃষ্টি, প্রায়োগিক গবেষণা, উদ্ভাবন এবং বিশ্বমানের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হবে।
রবিবার (১২ জুলাই, ২০২৬) শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী ‘সাস্ট কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল কার্নিভাল-২০২৬’-এর বর্ণাঢ্য সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগ এবং সিএসই সোসাইটির যৌথ উদ্যোগে এই বিশাল প্রযুক্তি উৎসবের আয়োজন করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে শিক্ষার্থীদের করণীয় সম্পর্কে গভীর দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান বিশ্বে নিছক একাডেমিক সাফল্যের পাশাপাশি বাস্তবমুখী সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, গবেষণামনস্কতা, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ অর্জন করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রেক্ষাপটে প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, উদ্ভাবনী হ্যাকাথন ও প্রযুক্তি মেলার মতো আয়োজনগুলো শিক্ষার্থীদের তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বাস্তব সমস্যা সমাধানে এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে প্রবলভাবে উৎসাহিত করে।
সাম্প্রতিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, সরকার জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। শিক্ষা খাতের বাজেটও পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট ও হলের সমস্যাগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে সমাধান হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। পাশাপাশি শিক্ষক সংকট দূর করার জন্যও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে বক্তব্য রাখেন শাবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. খায়রুল ইসলাম। তিনি তাঁর বক্তব্যে নিজেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সেবক হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “আমি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে চাই। শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের সুবিধার্থে আমরা ক্যাম্পাসে একটি মেগা ‘জব ফেয়ার’ বা চাকরি মেলার আয়োজন করার পরিকল্পনা করছি। এ লক্ষ্যে আমি ইতিমধ্যেই দেশের শীর্ষস্থানীয় ১৬টি প্রযুক্তি ও করপোরেট কোম্পানির সাথে আলোচনা সম্পন্ন করেছি এবং আগামীতে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে।”
উপাচার্য শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, “আমরা কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্যের (ইউনিক কোয়ালিটি) মাধ্যমে আমাদের শিক্ষার্থীদের এমনভাবে গড়ে তুলতে চাই, যাতে দেশ-বিদেশের জব মার্কেটে তাদের যোগ্যতা, চাহিদা ও মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এই সেরা সময়টাকে তোমরা যেন যথাযথভাবে নিজেদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজে লাগাতে পারো, সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।”
কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো. ফরহাদ রাব্বীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে গেস্ট অব অনার হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. ইসমাইল হোসাইন, অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মস্তাবুর রহমান, বিকাশ-এর চিফ প্রোডাক্ট অ্যান্ড টেকনোলজি অফিসার মোহাম্মদ আজমল হুদা এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ।
এছাড়াও দুই দিনব্যাপী আয়োজিত দেশের অন্যতম বৃহৎ এই প্রযুক্তি উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর পর্ব ছিল টানা ২৪ ঘণ্টার হ্যাকাথন এবং ৫ ঘণ্টার স্নায়ুক্ষয়ী প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা। হ্যাকাথনে অংশগ্রহণকারী দলগুলো নির্ঘুম রাত কাটিয়ে তাদের উদ্ভাবনী বুদ্বিগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার তীব্র লড়াইয়ে মেতে ওঠে। হলরুমের নিস্তব্ধতায় কেবল শত শত ল্যাপটপের পর্দার আলো, কি-বোর্ডের একটানা শব্দ আর কফির কাপে চুমুকের মাঝেই জন্ম নেয় আগামী দিনের নানা প্রযুক্তিগত সমাধান।
অন্যদিকে, ৫ ঘণ্টার ম্যারাথন প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় দেশের সেরা মস্তিষ্কের অধিকারীরা জটিল সব গাণিতিক ও অ্যালগরিদমভিত্তিক সমস্যা সমাধানে নিজেদের মেধার সর্বোচ্চ পরীক্ষা দেন।
এবারের সাস্ট কার্নিভালে সারা দেশের প্রায় ৮০টি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩৯টি মেধাবী টিম অংশগ্রহণ করে। সমাপনী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিজয়ী দলগুলোর হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট ও পুরস্কার তুলে দেন আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ।


