অনিরুদ্ধ দাস:
বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর যুগে প্রবেশ করেছে—এর ব্যবহার আমরা চারপাশেই দেখতে পাচ্ছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) বলতে বোঝায় এমন যন্ত্রগত সক্ষমতা, যার মাধ্যমে সাধারণত মানুষের বুদ্ধিমত্তা প্রয়োজন হয়—এমন কাজ যন্ত্র নিজে সম্পাদন করতে পারে। এআই কেবল দ্রুততর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেই সহায়ক হবে না, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলবে। এআইয়ের মতো উদীয়মান প্রযুক্তিতে যুগান্তকারী অগ্রগতির ফলে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছে। পূর্ববর্তী শিল্পবিপ্লবগুলোর মতোই এই বিপ্লবের সম্ভাবনা রয়েছে বিশ্বব্যাপী আয় বৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নত করার। তবে একই সঙ্গে আশঙ্কা রয়েছে—এটি বৈষম্য বাড়াতে পারে, শ্রমবাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে এবং এআইয়ের অনৈতিক ব্যবহারের ঝুঁকি ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এআইয়ের সম্ভাবনাকে দায়িত্বশীল ও ন্যায়সঙ্গতভাবে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে একাধিক বহুপাক্ষিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জি–২০ এআই নীতিমালা, জাতিসংঘ ও গ্লোবাল পার্টনারশিপ অন এআই (GPAI)-এর এআই সংক্রান্ত প্রস্তাব, আফ্রিকান ডিক্লারেশন অন এআই এবং হামবুর্গ ডিক্লারেশন অন রেসপনসিবল এআই। এসব উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, এআইয়ের রূপান্তরমূলক প্রভাব সীমান্ত অতিক্রম করে বৈশ্বিক সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন তৈরি করেছে। যুক্তরাজ্যের এআই সেফটি সামিট, এআই সিওল সামিট, ফ্রান্স এআই অ্যাকশন সামিট এবং গ্লোবাল এআই সামিট অন আফ্রিকার মতো আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোর ধারাবাহিকতায় ভারত ২০২৬ সালের ১৬–২০ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লিতে আয়োজন করতে যাচ্ছে এআই ইমপ্যাক্ট সামিট।
এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬:
ভারত বিশ্ববাসীকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে এআই ইমপ্যাক্ট সামিট ২০২৬-এ অংশ নিতে—যা গ্লোবাল সাউথে আয়োজিত সবচেয়ে বড় এআই সম্মেলনগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। পাঁচ দিনব্যাপী এই কর্মসূচিতে নীতি নির্ধারণ, গবেষণা, শিল্পখাত এবং জনসম্পৃক্ততা – সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সামিটটি বিদ্যমান বহুপাক্ষিক উদ্যোগগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি নতুন অগ্রাধিকার, কার্যকর ফলাফল এবং সহযোগিতামূলক কাঠামো এগিয়ে নেবে। এর লক্ষ্য হলো এমন একটি ভবিষ্যৎ পথনকশা তৈরি করা, যেখানে এআইয়ের রূপান্তরমূলক শক্তি মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হবে, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে, সামাজিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করবে এবং মানুষকেন্দ্রিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে আমাদের গ্রহকে সুরক্ষা দেবে। একই সঙ্গে সামিটটি গ্লোবাল সাউথের কণ্ঠকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরবে, যাতে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও সুযোগ কেবল কয়েকটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ না থেকে বিশ্বজুড়ে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এই সামিটে ১০০টিরও বেশি দেশের অংশগ্রহণ প্রত্যাশিত—যার মধ্যে প্রায় ২০ জন সরকারপ্রধান, ৫০ জনের বেশি মন্ত্রী এবং শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক ও ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের ৪০ জনের বেশি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থাকবেন। পাশাপাশি সাতটিরও বেশি বিষয়ভিত্তিক প্যাভিলিয়নে ৪০০-এর বেশি প্রদর্শক (এক্সিবিটর) অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে
ভারতের এআই যাত্রা:
ভারত এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত এক নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে, যেখানে প্রযুক্তি মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে এবং দেশের অগ্রযাত্রাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এআই আর শুধু গবেষণাগার বা বড় করপোরেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বাড়ানো থেকে শুরু করে কৃষকদের ফসল সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা – এআই দৈনন্দিন জীবনকে করছে আরও সহজ, বুদ্ধিদীপ্ত ও সংযুক্ত। এটি ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষকে রূপান্তরিত করছে, শহরকে করছে আরও পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ এবং দ্রুত ও তথ্যভিত্তিক শাসনের মাধ্যমে জনসেবার মান উন্নত করছে।
ভারত সরকারের নীতি-পরিকল্পনা বিষয়ক প্রধান থিঙ্ক ট্যাংক নীতি আয়োগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই ভারতের ৪৯ কোটি অনানুষ্ঠানিক (ইনফরমাল) শ্রমিককে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বাড়িয়ে ক্ষমতায়িত করতে পারে। এআই-চালিত সরঞ্জাম উৎপাদনশীলতা ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে পারে—যাঁরা ভারতের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রযুক্তি সামাজিক ও অর্থনৈতিক গভীর বিভাজন দূর করতে পারে এবং এআইয়ের সুফল যেন প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছায় তা নিশ্চিত করতে পারে। অন্তর্ভুক্তিমূলক এআই ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পথে ভারতের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পাচ্ছে। স্ট্যানফোর্ড এআই ইনডেক্স এআই দক্ষতা, সক্ষমতা ও নীতিমালার দিক থেকে ভারতকে শীর্ষ চারটি দেশের মধ্যে স্থান দিয়েছে। জাতীয় উদ্যোগ ও বৈশ্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে ভারতে এআই বাস্তব সমস্যা সমাধান, জনসেবা উন্নয়ন এবং সুযোগকে আরও সহজলভ্য করতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
গ্রহ, মানুষ ও অগ্রগতির জন্য এআই:
ভারত আয়োজিত এআই ইমপ্যাক্ট সামিটের ভিত্তি তিনটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে—গ্রহ (প্ল্যানেট), মানুষ (পিপল) ও অগ্রগতি (প্রগ্রেস)। ‘মানুষ’ স্তম্ভটি নিশ্চিত করে যে, এআই মানবকেন্দ্রিক থাকবে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান করবে, মর্যাদা রক্ষা করবে এবং নকশা ও প্রয়োগে অন্তর্ভুক্তিকে প্রাধান্য দেবে। ‘গ্রহ’ স্তম্ভটি পরিবেশ সুরক্ষা ও বৈশ্বিক স্থায়িত্ব জোরদারে দায়িত্বশীল উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে। আর ‘অগ্রগতি’ স্তম্ভটি এআইকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হিসেবে কল্পনা করে—যেখানে এর সুফল বৈশ্বিক উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং সুযোগের ন্যায্য প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে।
ভারতে আয়োজিত এআই ইমপ্যাক্ট সামিট কেবল বিশ্বনেতৃত্বের সমাবেশ নয়; এটি এআইয়ের ইতিবাচক প্রভাব বিস্তারের একটি দৃঢ় অঙ্গীকার। এই তিনটি স্তম্ভের মাধ্যমে বৈশ্বিক সম্প্রদায় এমন বাস্তব পথনির্দেশ তৈরি করবে, যাতে এআই গ্রহের সেবা করে, সব মানুষকে ক্ষমতায়িত করে এবং প্রতিটি দেশের জন্য অগ্রগতি ত্বরান্বিত করে।
বাংলাদেশ গ্লোবাল সাউথের অন্যান্য দেশের মতোই, উদীয়মান এআই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে পারে। বাংলাদেশ ইউনেস্কোর ১৯৩টি সদস্য দেশের একটি, যারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা বিষয়ক ইউনেস্কোর সুপারিশ গ্রহণ করেছে—যাতে এআই ন্যায়সঙ্গত, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ফলাফল নিশ্চিত করে। এআইয়ের এই নতুন যুগের সূচনালগ্নে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায়, এআই ইমপ্যাক্ট সামিট হতে পারে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ—যার মাধ্যমে দেশটি এআই অর্থনীতিতে নিজের অবস্থান নির্ধারণ করে জনগণকে ক্ষমতায়িত করতে এবং আগামীর কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারবে।
অনিরুদ্ধ দাস
সহকারী হাইকমিশনার,
ভারতীয় সহকারী হাইকমিশন, সিলেট


