হিমেল হান্নান, শাবি:
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলের লক্ষ্যে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি)। বিশ্ববিদ্যালয়টি ‘অর্জন, চর্চা, সৃষ্টি’- এই নীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১(১লা ফাল্গুন)। গৌরবময় ৩৫ টি বসন্ত পাড়ি দিয়ে আজ(১৪ ফেব্রুয়ারি) তিন যুগ পূর্তি হলো বিশ্ববিদ্যালয়টির।
১৯৯১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি তিনটি বিভাগ(পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও অর্থনীতি), ১৩ জন শিক্ষক ও ২০৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি অনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে শিক্ষাপ্রদানের মাধ্যমে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি,নতুন জ্ঞান ও আবিষ্কার সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া এবং
বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক দিক থেকে আরো টেকসই উন্নয়নের দিকে ধাবিত করতে বিশ্ববিশ্ববিদ্যালয়ের সকলে নিরলস ভাবে কাজ করছে। যার ফলশ্রুতিতে ৩২০ একরের উপর প্রতিষ্ঠিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অনন্য বিশ্ববিদ্যালয়টি নতুন নতুন গবেষণা ও উদ্ভাবনে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আলো ছড়াচ্ছে বিশ্বে।
বিগত বছরগুলোতে ইংরেজি দিনপঞ্জি অনুযায়ী ১৩ ফেব্রুয়ারি ধারাবাহিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন করা হলেও ২০২০ থেকে বাংলা দিনপঞ্জির সঙ্গে মিল রেখে ১লা ফাল্গুন (১৪ ফেব্রুয়ারি) দিনটিকে বিশ্ববিদ্যালয় দিবস হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে।বর্তমান প্রতিষ্ঠানটিতে ৭টি স্কুল, ২৭টি বিভাগ এবং ২টি ইনস্টিটিউট রয়েছে । শিক্ষক সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬৬ জনে, আর শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৮,৫৯৬। এর পাশাপাশি মেডিকেল সায়েন্স স্কুলের অধীনে রয়েছে এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজসহ ১২টি অনুমোদিত মেডিকেল কলেজ, যেখানে অধ্যয়ন করছে প্রায় ৪,০০০ শিক্ষার্থী।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির সাথে জার্মানির কার্লসরুয়ে প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট,ইতালির কালাব্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, চীনের চিংশু বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানি ফ্যাচকশিউল (বার্লিন),ফিনল্যান্ডের তামপেরে ফলিত বিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয় ও তুরস্কের বিলকেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সহযোগিতা চুক্তি রয়েছে।
২০২৫ সালের কিউএস এশিয়া র্যাঙ্কিংয়ে ৩৪২তম স্থানে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।এডুর্যাঙ্ক অনুযায়ী, বাংলাদেশের মধ্যে ১১তম এবং বিশ্বব্যাপী ৩৪৪৮তম স্থানে রয়েছে ।ভবিষ্যতের দিক বিবেচনায়, গবেষণা, শিক্ষার গুণমান ও একাডেমিক কার্যক্রমে আরও উন্নতি সাধনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক আইটি অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে , যার মধ্যে রয়েছে হাই-স্পিড নেটওয়ার্কিং, ক্লাউড ও ভার্চুয়ালাইজেশন সুবিধা, ক্যাম্পাস অটোমেশন সিস্টেম এবং ২৪/৭ টিয়ার-৩ ডেটা সেন্টার।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত অনেক প্রযুক্তি দেশে প্রথম ও অনন্য স্থান দখল করে রেখেছে। মোবাইল ফোনে ভর্তি কার্যক্রম শুরু, পুরো ক্যাম্পাস ওয়াইফাই সেবার আওতায় নিয়ে আসা, নিজস্ব ডোমেইনে ই-মেইল চালু, প্রথম বাংলা সার্চ ইঞ্জিন ‘পিপীলিকা’ উদ্ভাবন, যানবাহন ট্র্যাকিং ডিভাইস উদ্ভাবন, চালকবিহীন বিমান (ড্রোন) উদ্ভাবন, বাংলায় কথা বলা সামাজিক রোবট ‘রিবো’ তৈরি, হাঁটতে চলতে সক্ষম রোবট ‘লি’ তৈরি, অনলাইনে টান্সক্রিপ্ট উত্তোলনের সুবিধা চালু, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার কিবোর্ড তৈরি , রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যানসার নির্ণয়ের পদ্ধতি উদ্ভাবনসহ অসংখ্য উদ্ভাবন রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের।
বাংলাদেশে ইন্টিগ্রেটেড অনার্স প্রোগ্রাম চালু করা প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল । ১৯৯৬–৯৭ শিক্ষাবর্ষে সেমিস্টার পদ্ধতি চালু করে, যা শিক্ষার মানে দৃশ্যমান উন্নতি এনেছে, এমনকি জাতীয় পর্যায়েও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা নাসা আয়োজিত স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে ৭৯টি দেশের বাছাইকৃত ২৭২৯টি দলের সঙ্গে লড়াই করে শীর্ষ চারে জায়গা করে নেয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দল ‘টিম অলিক’।সর্বশেষ দেশের প্রযুক্তি খাতে অবদানের জন্য ‘দেশসেরা ডিজিটাল ক্যাম্পাস অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে শাবিপ্রবি।
শুধু শিক্ষা ও গবেষণায় নয়, মানবিকতায়ও অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে শাবিপ্রবি। অতিমারী করোনাকালে নিজস্ব অর্থায়নে জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধীনে করোনা শনাক্তরণ ল্যাব তৈরি করেছে। এতে করে এই অঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কমিয়েছে। করোনা ভাইরাসের জিনোম রহস্য উন্মোচন করে ৩০ ধরনের পরিবর্তিত করোনাভাইরাস শনাক্ত করেছে শাবিপ্রবির গবেষক দল।
প্রথম পর্যায়ে ২০০ কোটি টাকা অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ফাতিমা তুজ জাহরা(পূর্বনাম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল) সৈয়দ মুজতবা আলী হলের অসমাপ্ত তিন-চতুর্থাংশ, সেন্টার এক্সেলেন্স ভবন, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের দ্বিতীয় ভবন, টেনিস কোর্ট, আইআইসিটি ভবনের অসমাপ্ত পঞ্চম থেকে দশম তলার নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ৯৮৭ কোটি ৭৯ লাখ টাকার অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প কাজ চালছে । এই প্রকল্পের আওতায় শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন, চতুর্থ ছাত্রী হল, চতুর্থ ছাত্র হল, ফলিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক বিভাগসমূহের দুটি একাডেমিক ভবন, কর্মচারীদের জন্য একটি আবাসিক ভবন, ভৌত বিজ্ঞান, কৃষি ও খনিজ বিজ্ঞান বিষয়ক বিভাগসমূহের জন্য একটি একাডেমিক ভবন, ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসায় প্রশাসন, বাংলা, ইংরেজি বিভাগ ও আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের জন্য একটি একাডেমিক ভবন, গ্র্যাজুয়েট ও বিদেশি ছাত্রদের জন্য হোস্টেল, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজের জন্য একটি ভবন, চারতলা বিশিষ্ট মসজিদ সহ দুটি সংযোগ সেতু নির্মানের কাজ চলমান।
শিক্ষার্থীদের আবাসিক সুবিধা প্রদানের জন্য বর্তমানে মোট ৬টি আবাসিক হল রয়েছে। যার মধ্যে ৩টি ছেলেদের জন্য ও ৩টি মেয়েদের জন্য বরাদ্দ। বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে সৃজনশীলতার চর্চার জন্য রয়েছে অর্ধ-শতাধিক সংগঠন ।
১৯৯০ সালে মাত্র কিছু বই ও চারটি কক্ষে লাইব্রেরি শুরু হলেও আজ এটি একটি আধুনিক ৪ তলা ভবনে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা সেবা প্রদান করা হয়। এখানে ৭৫ হাজারের বেশি বই, ৬ হাজারের বেশি জার্নাল এবং ২৩টি দৈনিক পত্রিকা রয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনে সহায়ক।
গ্রন্থাগারটি ২৫ হাজারের বেশি ই-জার্নাল এবং ই-বুক সাবস্ক্রাইব করে, যা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও পড়াশোনায় আরও এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আধুনিকায়িত লাইব্রেরিটি কোহা সফটওয়্যারের মাধ্যমে ২০১৩ সাল থেকে ডিজিটালাইজড হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা সহজেই বই খুঁজে পেতে এবং আরএফআইডি সিস্টেমের মাধ্যমে বই ধার নেওয়া যায়।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যায়ে শিক্ষার গুনগত মান যাতে বজায় থাকে, সেজন্য ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের সহায়তায় আইকিউএসি চালু হয়। প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট ও ইন্সটিটিউট এর শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে নিগূঢ়ভাবে গবেষণা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে নিরলস ভাবে কাজ করছে।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম ঠিকভাবে পরিচালনা করতে ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সাস্ট রিসার্চ সেন্টার। সেন্টারটি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ড ম্যানেজ থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা করে থাকে।
শাবিপ্রবি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি হাজারো স্বপ্নবাজ তরুণের আশ্রয়, গর্ব আর সম্ভাবনার একটি নাম।
৩৬বছর পূর্তি উপলক্ষে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন, কেক কাটা, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিনটি উদযাপন করবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সাজেদুল করিম বলেন,প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটা কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন যুগ পূর্তি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং আবেগের জায়গা। তিন যুগ পূর্তিতে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণ ও সমৃদ্ধি অর্জনে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।


