আধুৃনিক ডেস্ক ::
না ফেরার দেশে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। থেমে গেল দীর্ঘ ৪৩ বছরের সংগ্রামী, লড়াকু এক রাজনৈতিক জীবন। জাতি হারালো রাজনীতির এক অভিভাবক। মানুষ আর গণতন্ত্রের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন গণমুখী রাজনীতির উজ্জ্বল এক নক্ষত্র, গণতন্ত্র ও অধিকার রক্ষায় এক লড়াকু সৈনিক। লাজুক গৃহবধূ থেকে রাজনীতির ময়দানে পা রাখা বেগম খালেদা জিয়া প্রতিটি গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে ছিলেন সামনের সারির লড়াকু এক যোদ্ধা। নির্বাচনী লড়াইয়ে যার কোনো পরাজয় নেই। ৩০ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন খালেদা জিয়া। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। কিডনি, হৃদরােগ এবং নতুন করে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় এক মাস যাবত তিনি ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাওয়ায় ২৩ নভেম্বর জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেয়া হয় খালেদা জিয়াকে। এর আগে ২১শে নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রওনা দিয়ে গাড়িতে ওঠেই অস্বস্তি বোধ করছিলেন তিনি। বহু বছর ধরেই তিনি লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস এবং চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। গত মাসের শেষ দিকে খালেদা জিয়ার অবস্থা ‘সংকটময়’ জানানোর পর থেকেই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ‘উৎকণ্ঠা’ তৈরি হয়। এরপর থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে দলের সর্বস্তরে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমেও তার সবশেষ অবস্থা নিয়ে নানা গুঞ্জন তৈরি হতে থাকে। তবে বিএনপির পক্ষ থেকে নিয়মিত ব্রিফিং করে বা লিখিতভাবে তার স্বাস্থ্যের অবস্থার আপডেট জানানো হতে থাকে। খালেদা জিয়াকে এর মধ্যেই আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হলেও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তা আর করা যায়নি। দেশ-বিদেশের চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই গত ২৫ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান ১৭ বছর পর যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফেরেন।
১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপি’র প্রাথমিক সদস্য রূপে দলে যোগ দেবার পর থেকে মোট পাঁচবার তিনি গ্রেপ্তার হন। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে মোট ৩৭টি মামলা করা হয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর গ্রেপ্তার হন। তিনি ২০০৭ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর দুর্নীতির অভিযোগে পুত্রসহ আটক হন। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তিনি সর্বোচ্চ বিচারালয়ের নির্দেশে মুক্তিলাভ করেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক বন্দি হওয়ার পর দীর্ঘ এক বছর সাতদিন কারাগারে অবস্থানকালে তার বিরুদ্ধে চলতে থাকা কোনো অভিযোগেরই উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি এবং চলতে থাকা তদন্তে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগই প্রমাণিত হয়নি। ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২ কোটি ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের দায়ে তার ৭ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হয়। এরপরই তাকে বন্দি করে পুরান ঢাকার পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। দেশে করোনা মহামারি শুরুর পর পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালের ২৫শে মার্চ তাকে নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে সাময়িক মুক্তি দেয় সরকার। এরপর থেকে তিনি গুলশানের ভাড়াবাসা ফিরোজায় উঠেন। ২০২১ সালের মে মাসে করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন তিনি। তখনো শ্বাসকষ্টে ভোগার কারণে তাকে করোনারি কেয়ার ইউনিটে থেকে চিকিৎসা নিতে হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে পেসমেকার বসানো হয়। তখনো তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিলো। এর আগে থেকেই তার হার্টে তিনটি ব্লক ছিল। আগে একটা রিংও পরানো হয়েছিল। এছাড়া ২০২৪ সালের জুনে পোর্টো সিস্টেমেটিক অ্যানেসটোমেসির মাধ্যমে খালেদা জিয়ার লিভারের চিকিৎসাও দেওয়া হয়েছে বিদেশ থেকে ডাক্তার এনে।
আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিলো আদালত, তারপর থেকে প্রথমে কারাগারে বিশেষ ব্যবস্থায় ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। দুর্নীতির আরেকটি মামলাতেও তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে হাসপাতালে থাকা অবস্থাতেই নির্বাহী আদেশে বিশেষ শর্তে মুক্তির পর তিনি গুলশানের বাসায় উঠেন। ২০২৪ সালে অগাস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ৬ই অগাস্ট রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাকে সব দণ্ড থেকে পুরোপুরি মুক্তি দেওয়া হয়।
খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার জলপাইগুঁড়িতে যা বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি জেলা। বাবা এস্কান্দার মজুমদার এবং মা বেগম তৈয়বা মজুমদার। তিন বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। আদি পৈতৃকনিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের মজুমদার বাড়ী। বাবা এস্কান্দার মজুমদার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। মা বেগম তৈয়বা মজুমদার ছিলেন গৃহিণী। খালেদা জিয়ার শৈশব ও শিক্ষা জীবন কাটে দিনাজপুরে। শৈশবে তিনি খালেদা খানম পুতুল নামে পরিচিত ছিলেন। পাঁচ বছর বয়সে খালেদা খানম পুতুলকে তার বাবা দিনাজপুরের সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে ভর্তি করান। সেখানে খালেদা জিয়া প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি দিনাজপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬০ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৩ সালে এ কলেজ থেকে খালেদা জিয়া ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দিনাজপুরের মুদিপাড়ায় পিত্রালয়ে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট সেনাবাহিনীর তরুণ ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খালেদা খানম পুতুলের বিয়ে হয়। এরপর থেকে তিনি খালেদা জিয়া বা বেগম খালেদা জিয়া নামে পরিচিতি লাভ করেন। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যখন তার বিয়ে হয় তখন জিয়া ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। ডিএফআই-এর কর্মকর্তা রূপে তখন দিনাজপুরে কর্মরত ছিলেন। জিয়া-খালেদা দম্পতির দুই ছেলে। বড় ছেলে তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। ছোটজন আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট। কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়াতে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মে সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্যের গুলিতে শহীদ হন। মাত্র ২১ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে ৩৬ বছর বয়সে খালেদা জিয়া অকাল বৈধব্য বরণ করেন। জিয়াউর রহমান কখনো স্ত্রীকে রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করেননি। তাঁর প্রয়াণের পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। শুরু হয় তার রাজনৈতিক জীবন। দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব সমুন্নত রাখার পাশাপাশি এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী গণ-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথমেই দলের শীর্ষ পদ পাননি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ভাইস চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের পর বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নিজের ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছরই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়েছিল ৭ দলীয় ঐক্যজোট। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি ‘এরশাদ হটাও’ শীর্ষক এক দফা আন্দোলন শুরু করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন–সংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিজয়ী হয়। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে শপথ নেন। তিনি ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় এবং ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে ও ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মোট ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করেছেন। কোনোটিতেই তিনি পরাজিত হননি।


