মঈন উদ্দিন ::
সালটা মনে নেই। দু’দশক তো হবে। এই অঞ্চলের জনপ্রিয় কাগজ শ্যামল সিলেটে কাজ করি। আমাকে পত্রিকা থেকে এসাইনমেন্ট দেওয়া হলো ভোলাগঞ্জে গিয়ে নিউজ কাভার করার জন্য। কী নিউজ? পাথর লুটপাটের। ওই সময়ের বিবেচনায় ভোলাগঞ্জ কিন্তু বিশাল দূরে। রাস্তাঘাাট সরু এবং ভাঙাচোরা।
গাড়িঘোড়াও অতোটা চলে না, সংখ্যায় কম। জার্নিটা কষ্টকর। তারপরও আমার কাছে ভোলাগঞ্জের কদর একটু বেশিই। সেখানকার প্রকৃতি, অপরূপ নিসর্গ। কখনো যাওয়া হয়নি। ভোলাগঞ্জের রূপ লাবণ্য নিয়ে গল্প শুনতে শুনতে সেখানকার প্রতি একটা অদ্ভুত আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। সুতরাং সুযোগটিকে কাজে লাগালাম। সংবাদ সংগ্রহ হলো, ভোলাগঞ্জের সৌন্দর্য্যও ছুয়ে আসা হলো। যাওয়ার জন্য দিনক্ষণ ঠিক করলাম। এর ফাঁকে অবশ্য টুকটাক তথ্যও সংগ্রহ করে নিলাম। আমার সঙ্গী শ্যামল সিলেটের ফটো সাংবাদিক এ এইচ আরিফ।
নির্ধারিত দিনে আমরা যাত্রা শুরু করলাম। শীতকাল। টু স্ট্রোকে (বেবি ট্যাক্সি, যেটি সিএনজি অটোরিকশার পুরাতন সংস্করণ) চেপে বসেছি। চলছি। পথ যেনো ফুরোয় না। মাঝেমধ্যে যাত্রা বিরতি। চায়ের কাপে চুমুক। অনেকটা পিকনিক মুড। তবে রাস্তার ধুলোয় কাতর করে তুললো। যাহোক, একসময় গন্তব্য চোখে ধরা দিলো। এখন যেখান থেকে আমরা নৌকায় উঠি, নামলাম সেখানেই। এই সময়ে এখানে রেস্টুরেন্ট-দোকানপাট হয়েছে, আগে কিছুই ছিলো না।
ট্যাক্সি থেকে নেমে বেশ অবাকই হলাম। আমার ধারণার চেয়েও বেশি শ্রমিক, হাজারে হাজারে। বারকি নৌকা শ’য়ে শ’য়ে। ধলাই নদীর বুক চিরে পাথর তুলছেন শ্রমিকরা। পাথরের সাম্রাজ্য। এখনকার মতো এতো প্রশস্ত ছিলোনা ধলাই নদী। শীতে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া নদীর স্থানে স্থানে পাথর উত্তোলনের উৎসব। গর্ত খুড়ে অনেক গভীর থেকে পাথর তুলে নিয়ে আসা হচ্ছে। এটাই সনাতন পদ্ধতি। অবশ্য এই পদ্ধতিতে পাথর তুলতে গিয়ে অনেক শ্রমিকেরই প্রাণ গেছে। আর যারা লাভবান হওয়ার কথা তারা ঠিকই হয়েছে।
যাহোক, সৌখিন ফটোগ্রাফারের ছদ্মবেশ নিয়ে বিভিন্নজনের কাছ থেকে তথ্য নিচ্ছি, কর্মযজ্ঞ দেখছি। আর চোখ-কান খোলা রেখেছি একজনের আসার অপেক্ষায়। যিনি এই পাথর সাম্রাজ্যের অলিখিত অধিপতি। প্রতিদিন কোয়ারি থেকে কোটি টাকা তার আয়। সেটা আবার অবৈধ পথে। এমন কোনো বারকি নৌকা নেই যেখান থেকে তার পকেটে টাকা যায় না। রাত বিরাতে তার গন্তব্যে টাকা পৌছে দেওয়া হয়। আর তিনিও প্রতিদিন একবার হলেও আসেন কোয়ারি এলাকায়। নাম জানলেও তাকে তো আর চিনি না। অনেক শ্রমিককেই জিজ্ঞেস করলাম তিনি ক’টায় আসেন। তারা আৎশ্বস্ত করলেন চলে আসবেন। দুপুর গড়িয়ে বিকেল, এ অবস্থায় হঠাৎ করেই যেনো নড়েচড়ে উঠলো কোয়ারি এলাকা। আগমন ঘটেছে সেই মহাশক্তিধরের। তাকালাম আর অবাক হলাম। এরকম একটা দুর্গম এলাকায় এতো জৌলুস, এতো চাকচিক্য। মেরুন রঙের দামি প্রাইভেট কার। সামনে পেছনে অন্তত তিরিশটা মোটরসাইকেল। চালক আরোহী সবাই যুবক। একজন গাড়ির দরজা খুলে দিলো।
ভারতের দক্ষিণী সিনেমার ঘ্রাণ পেলাম। পেছনের সিট থেকে নেমে এলেন রাজপুত্র। পায়ে কালো রঙের শু, সাদা শার্ট, সাদা লুঙি। হাতে ব্রেসলেট-দামি ঘড়ি। চোখে কালো চশমা। রাজসিক ভঙ্গিতে হাটা শুরু করলেন। পেছনে তার পথ অনুসরণ করলো যুবকরা। তাদের কারো কারো হাতে আবার লাঠি।
আগে থেকেই ইঞ্জিন নৌকা প্রস্তুত করে রাখা ছিলো। তিনচার জনকে নিয়ে একটায় উঠলেন তিনি। নৌকা ছেড়ে দিলো। বাকিরাও তাকে অনুসরণ করতে লাগলো অন্য নৌকা করে। আমরাও পিছু নিলাম। তার গন্তব্য জিরো পয়েন্ট। সেখানে পৌছালো তার নৌকা। নামলেন। এবং বেশ এগিয়ে গেলেন তিনি। আমরাও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে নামলাম সেখানে। দূরে পাহাড় আর নীল জলরাশির স্রোতধারা। জিরো পয়েন্টজুড়ে পাথর আর পাথর। বিকেলের রোদ পড়ছে পাথরের গায়ে। এক অপার্থিব সৌন্দর্য। যেনো সাদা আলোর বিচ্ছুরণ। হ্যা, এটাই এখনকার সাদাপাথর। সাদাপাথর এলাকায় কিছুক্ষণ অবস্থান করে ফিরে আসছিলেন ‘রাজপুত্র’। হ্যাঁ, তিনি যেনো ‘পাথর রাজ্যে’র রাজপুত্রই। সামনে তিনি, পেছনে লাঠিসোটা হাতে তরুণরা। এই অবস্থায় আরিফের ক্লিক, জ¦লে উঠলো ফ্ল্যাশ। ব্যস্। এতটুকুই।
তখন প্রাণে বাচার লড়াই। লাঠি হাতে তরুণরা ঘিরে ধরলো আমাদের। কেনো ছবি উঠালে, তোমরা কারা, তোমরা কী সাংবাদিক- এরকম হাজারো প্রশ্ন। কেউ মারতে উদ্যত হলো, কেউ ক্যামেরা কেড়ে নিতে চাইলো। শেষমেষ নিরূপায় হয়ে রাজপুত্র শামীমেরই (পাথর শামীম নামে যিনি পরিচিত, পরে উপজেলা চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন) শরণাপন্ন হতে হলো। তাকে অনেক বোঝালাম, আমরা সাংবাদিক নই। বেড়াতে এসেছি। দীর্ঘক্ষণ পর মন গললো তার। রেহাই পেলাম।
এবং ফিরে এলাম প্রাণের শহরে। এই নিয়ে দুই পর্বের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় শ্যামল সিলেটে। আর এতে নাখোশ হন অনেকে। শামীমের টাকার ভাগ পেয়েছেন অনেকেই। প্রশাসনযন্ত্র থেকে শুরু করে রাজনীতিক, অনেকের কাছেই শামীম ছিলেন টাকা বানানোর মেশিন। অবশ্য প্রতিবেদন প্রকাশের পর বেশ ক্ষতিই হয় তাদের। আমার মতো অনেকের লেখনীর কারণেই হয়তো সেই সময় রক্ষা পেয়েছিলো সেই পাথর রাজ্য।
স্মৃতি হাতড়ে আজকের এই লেখা শুধুই মনের আবেগ থেকে। সেই ভোলাগঞ্জ আর এই ভোলগঞ্জ-কোনো মিল খুজে পাই না। আমার দেখা জিরো পয়েন্টের যেখানে পাথরের রাজ্য ছিলো, পরবর্তীতে সেখানকার নাম পায় সাদাপাথর। এই নামকরণের গল্প কমবেশি সকলেরই জানা। পর্যটকরা ভালোবেসে নাম দিয়েছিলেন সাদা পাথর। এ এক আদুরে নাম। সাম্প্রতিক লুটপাট ধ্বংস করে দিয়েছে প্রকৃতির অনন্য এই সৃষ্টিকে। আমরা বড়ই নিষ্ঠুর। এক ‘রাজপুত্র’ যায় আরেক ‘রাজপুত্র’ এসে উঁচিয়ে ধরেন লুটপাটের পতাকা।
মঈন উদ্দিন , সম্পাদক দৈনিক আধুনিক কাগজ


