মাইন উদ্দিন, শাবিপ্রবি:
জ্ঞানের চর্চা, সংরক্ষণ ও মানবজাতির কল্যানে জ্ঞান বিতরণের জন্য কালের প্রয়োজনে গড়ে উঠেছে গ্রন্থাগার। আজ আমরা যে আধুনিক গ্রন্থাগার দেখি তার ইতিহাস দুই হাজার বছরের বেশি। তবে এর আগে ৪০০০-৫০০০ বছর পূর্বেও গ্রন্থাগারের অস্তিত্ব ছিলো বলে ধারণা করেন গবেষকরা। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া লাইব্রেরি আধুনিক লাইব্রেরির অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০১৭ সালের ৩০ অক্টোবর মন্ত্রীপরিষদের এক সভায় ৫ ফেব্রুয়ারী জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে গৃহীত হয়। ১৯৫৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের দিনটিকে স্বরণে রাখতে এই দিনটিকে জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে এই দিনটি জাতীয় গ্রন্থাগার দিবস হিসেবে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে পালন হয়ে আসছে।
গ্রন্থাগার দিবসে শাবিপ্রবির শিক্ষার্থীদের ভাবনা জানতে চাইলে শিক্ষার্থীরা তাদের ভাবনা তুলে ধরেন,
বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বই পড়ার বিভিন্ন মাধ্যম রয়েছে পিডিএফ ফরম্যাট, ই-বুক, কিংবা অনলাইন লাইব্রেরি।তবুও ছাপানো বইয়ের যে একটা গন্ধ ও অনুভূতি, তা কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব হয় না। এবং সেই ছাপানো বইয়ের ভান্ডার হচ্ছে গ্রন্থাগার। আমাদের দেশে পাবলিক গ্রন্থাগারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম হলেও বর্তমানে ‘গ্রন্থাগার দিবস’ পালনের প্রবণতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ সহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোতে এই দিবসকে কেন্দ্র করে সেমিনার, প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। বই মানুষের চিন্তা-চেতনা বিকাশ করে, জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে। তরুণদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ তৈরিতে ‘গ্রন্থাগার দিবসকে’ কেন্দ্র করে সেমিনার, রচনা প্রতিযোগিতা, বইমেলা ইত্যাদি আয়োজন করা যেতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে বই পড়ায় অনুপ্রাণিত করবে এবং জ্ঞানের চর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
ফারজানা আক্তার রিমি
সমাজকর্ম বিভাগ(২০১৯-২০)
প্রমথ চৌধুরীর মতে, ‘লাইব্রেরি হচ্ছে এক ধরনের মনের হাসপাতাল।’পাঠাগার শুধু ভালো ছাত্রই নয়, ভালো মানুষও হতে শেখায়। প্রযুক্তির প্রসারে আমাদের ঐতিহ্যবাহী গ্রন্থাগার সংস্কৃতির গুরুত্ব ভুলে গেলে চলবে না। পাঠক সৃষ্টি, গবেষণা সহায়তা, সাহিত্যচর্চা এবং মুক্তচিন্তার বিকাশে গ্রন্থাগারের অবদান অপরিসীম।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানব জীবনে গ্রন্থাগারের অবদান সম্পর্কে আমরা সম্ভবত সবচেয়ে কম জানি, জানতে চাইও না। আর সে কারণেই আজকের বাংলাদেশে গ্রন্থাগার এক বিরাট ঐতিহ্যের ধারক হয়েও, একটি ঋদ্ধ উত্তরাধিকারী হয়েও কোনো এক অজানা পরিণতি বহন করতে যাচ্ছে বলে শঙ্কা জাগে। কেননা ক্রমশ পাঠবিমুখ,বইবিমুখ সর্বোপরি জ্ঞানবিমুখ হওয়ার এক উদগ্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে উঠছে বাংলাদেশ। অথচ বই ও পাঠকের মেলবন্ধনেই গ্রন্থাগার। আর তাই কমতে থাকা পাঠক নিয়ে আমাদের গ্রন্থাগার বা পাঠাগারগুলো শুধু ভবন আর বই নিয়ে নির্বাসিত কাল যাপন করবে কিনা, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। তাই ২০২৫ সালের গ্রন্থাগার দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক—আমরা সবাই পাঠাগারমুখী হব, জ্ঞানচর্চাকে আরও বিস্তৃত করব এবং নতুন প্রজন্মকে বইয়ের আলোয় আলোকিত করব।
সুস্মিতা ভট্টাচার্য মৌ
নৃবিজ্ঞান বিভাগ (২০২০-২১)
“কত নদী সমুদ্র পর্ব্বত উল্লঙ্ঘন করিয়া মানবের কণ্ঠ এখানে আসিয়া পৌঁছিয়াছে— কত শত বৎসরের প্রান্ত হইতে এই স্বর আসিতেছে। এসো এখানে এসো, এখানে আলোকের জন্মসঙ্গীত গান হইতেছে।”— রবীন্দ্র রচিত ‘লাইব্রেরী’ প্রবন্ধ।
পাঠ্যসূচি থেকে সংস্কৃতিচর্চা, বিদ্যার্জন থেকে জ্ঞানগর্ভ গবেষণা— সব ক্ষেত্রেই লাইব্রেরির অপরিমেয় ভূমিকা। অন্তহীন জ্ঞানের উৎস লাইব্রেরী শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক নীরব সাধনক্ষেত্র। লাইব্রেরী চর্চার মধ্যে দিয়ে একটি জাতি নতুন পথের দিশা পায়, বুদ্ধিভিত্তিক জাতির আখ্যা লাভ করে। গ্রন্থাগার হতে পারে একটি জাতির বিকাশ ও উন্নতির মানদণ্ড।ডিজিটাল যুগে পাঠাগারে আসা পাঠকের সংখ্যা কমেছে অনেক। শতাব্দী থেকে শতাব্দী ধরে মানুষের জ্ঞান জমা বইয়ের আবাসস্থল লাইব্রেরী যে জ্ঞানচর্চার একটা গণপরিসর তৈরি করেছে,ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তার বিকল্প হতে পারে না। ‘আলোকিত মানুষ চাই’ স্লোগানে রাস্তায় চলমান বা স্কুলের আঙিনায় দাড়ানো বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরীর সঙ্গে আমার বাল্যস্মৃতি নিবিড়ভাবে জড়িত। এই সাহিত্য কেন্দ্রের একজন পাঠক ছিলাম। আমার পাঠক্ষুদা মিটতো এখান থেকেই। দেশে জেলা শহরের অনেক পুরাতন লাইব্রেরী বন্ধ হওয়ার পথে। ছোট ছোট গ্রন্থাগারগুলো বন্ধ হয়ে গেছে এক এক করে। আলো নিবে যাওয়ার মতো। জ্ঞানচর্চার গণপরিসরে অন্ধকার নেমে না আসুক।
হাফিজুর ইসলাম
অর্থনীতি বিভাগ(২০২১-২২)
বই মানেই তো জ্ঞান,
বই মানেই তাও আলো,
বই পড়লে দূর হয়ে,
মনের সকল কালো,
“কাজী নজরুল”
শতাব্দীর পর শতাব্দী জুড়ে জ্ঞানের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে গ্রন্থাগার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে । যদিও গ্লোবালাইজেশনের যুগে ডিজিটাল প্রযুক্তি নির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে শুরু করে জীবনের প্রায় প্রতিটি স্থর। কিন্তু একটা গ্রন্থাগার যে পরিমাণ পাঠক মনের তৃপ্তি মিঠায় ডিজিটাল প্লাটফর্ম দ্বারা তা কখনোও সম্ভব নয়। বরং এ-ই প্রযুক্তির অপব্যবহার শিক্ষার্থীদের জ্ঞান চর্চা বিমুখ করতেছে, কমছে লাইব্রেরীর সাথে তাদের সম্পর্ক যার ফলে বর্তমান সময়ে লাইব্রেরি এক প্রকার অকেজো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে চলেছে। তাই জ্ঞান চর্চা চির পরিচিত স্থান লাইব্রেরির সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে প্রযুক্তির একপাক্ষিক আগ্রাসন থেকে নিজের মনন কে মুক্ত চর্চার সুযোগ দেয়। অজপাড়াগাঁ থেকে অট্টালিকার শহরের প্রতিটি গলিতে জ্ঞান চর্চার জন্য গ্রন্থাগার গড়ে তুলি। তাই হুমায়ূনের ভাষায় “বই পড়া মানে নিজেকে জানা,আর গ্রন্থাগার হলো সেই জানার ঠিকানা”।
সবাই কে গ্রন্থাগার দিবসের শুভেচ্ছা।
কফিল আহমেদ
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ (২০২২-২৩)