কুহিনূর রহমান নাহিদ, শান্তিগঞ্জ:
সুনামগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত শান্তিগঞ্জ উপজেলা। এই উপজেলার পশ্চিম পাগলা ইউনিয়নের একটি গ্রাম শত্রুমর্দন। এখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা সুব্রত দেবনাথ রামাচরণ নামের এক তরুণের, যিনি পেশায় ব্যবসায়ী হলেও ‘রামাচরণ’ ছদ্মনামে লিখে চলেছেন একের পর এক হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া গান।

রামাচরণের বয়স এখন ৩০ বছর। জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্যবসা করলেও গান লেখাটা তার কাছে শুধুই শখ নয়, বরং এক রকম ভালবাসার নেশা। তিনি বলেন, আমি লেখক মানুষ, সংগীতজ্ঞ নই, তবে শব্দে সুর বসে গেলে তা হৃদয়ে ঢুকে পড়ে।
করোনা থেকে গান লেখার যাত্রা:
গান লেখার শুরুটা হয়েছিল করোনা মহামারির সময়। যখন চারদিক নিস্তব্ধ, মানুষ ঘরবন্দী, তখন ফেসবুক লাইভে গান পরিবেশন করছিল শান্তিগঞ্জ উদীচীর শিল্পীরা। একদিন রামাচরণের সহকর্মী রিংকু সেই গান শুনে গলা মেলাচ্ছিলেন। তখনই মজা করে রামাচরণ বলেন, “পুরনো গান গাচ্ছিস কেনো? আমি নতুন গান লিখে দেই, গাইতে পারবি?” সেই থেকেই শুরু।
প্রথম দিকে রামাচরণ নামে তিনি নিয়মিত গান লিখতে থাকেন। রিংকু গানগুলো গেয়ে ফেসবুকে আপলোড দিতেন। যদিও গান লেখার সূচনাটি করোনার দুই বছর আগেই, একটি ধামাইল গান দিয়ে।
রামাচরণের গানে মূলত কোনো নির্দিষ্ট বিষয় নেই। প্রেম, দেশ, হাওর, সমাজ সবই তার কলমে উঠে আসে। তবে তিনি স্বীকার করেন, তার সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা কিংবদন্তি লোকসংগীতশিল্পী শাহ আব্দুল করিম। গান লেখার কৌশল ও দিকনির্দেশনায় পেয়েছেন জনপ্রিয় গীতিকার বুলবুল আনাম ও উর্বশী গানের সিঁড়ির গীতিকার হারুনুর রশিদের সহায়তা।
ইত্যাদিতে গান, ইউটিউবে কোটির ভিউ:
২০২৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর, বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংবাদ শেষে সম্প্রচারিত ইত্যাদি অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয় রামাচরণের লেখা “পুরা জগৎ জানে, পুরা জগৎ মানে” শিরোনামের গানটি। গেয়েছেন সেলিম চৌধুরী ও তোসিবা বেগম। সেলিম চৌধুরী প্রথমে একটি ভালো ডুয়েট গানের অনুরোধ জানালেও রামাচরণ তখনও জানতেন না, এটি ইত্যাদি-তে পরিবেশিত হবে।
এছাড়াও দেশের জনপ্রিয় শিল্পীরা যেমন ডলি সায়ন্তনী, গামছা পলাশ, সালমা, বন্যা তালুকদার, রাজু মণ্ডল, আয়েশা জেবিন দিপাসহ অনেকেই সুব্রতের লেখা গান গেয়েছেন। তার “প্রেমের মোহনায়” গানটি ফেসবুক ও ইউটিউবে মিলিয়ে ইতোমধ্যে ২ কোটিরও বেশি দর্শকের মন জয় করেছে।
হাওরের সন্তান, ডিজিটালের শক্তি:
রামাচরণ নিজে গান শেখেননি, কেবল গীতিকার হিসেবেই কাজ করেন। তার কথায়- “আমি হাওরে থাকি, ঢাকায় থাকলে হয়তো গানটাকেই পেশা করতে পারতাম। তবে এখন প্রযুক্তির বদৌলতে মোবাইল আর ফেসবুক দিয়েই শিল্পীদের কাছে গান পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।”
সিনেমার গান লেখার স্বপ্ন:
রামাচরণের স্বপ্নের জায়গা সিনেমা। তিনি বলেন, “সিনেমায় গান লেখার প্রস্তাব এসেছিল, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। ভবিষ্যতে সিনেমা, ওয়েব সিরিজ এমনকি জাতীয় দিবসের জন্য গান লেখার আগ্রহ আছে।”
তিনি বলেন, অনেকেই এখন তাঁর কাছে গান প্রচারের পরামর্শ নিতে আসেন, যার মধ্যে তরুণরাও আছেন। “আমি চেষ্টা করি সবাইকে সহযোগিতা করতে, যদিও সাংগঠনিকভাবে কোনো সংগঠনের সাথে যুক্ত নই।”
একটুখানি প্রশান্তি, অনেকখানি সম্ভাবনা:
রামাচরণের মতে, মদ-গাঁজার মতো ক্ষতিকর নেশা না, গান হচ্ছে এমন এক নেশা যা মানুষকে শান্তি দেয়। এই নেশায় মানুষ হারায় না, বরং খুঁজে পায় নিজেকে।
বর্তমানে ব্যবসা ও পারিবারিক কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে নিয়মিত গান লিখতে পারছেন না। তবুও তাঁর কথা, জীবন একটু স্থির হলে আবার গানে মনোযোগ দিতে চাই। নিয়মিত গান লিখলে আরও ভালো কিছু দিতে পারবো।
সরকারের করণীয়:
তিনি মনে করেন, দেশে গান ও সুস্থ সংস্কৃতির জন্য একটি পুষ্ট পরিবেশ তৈরি করা দরকার। অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও হাওরের মতো এলাকার তরুণরা পেছনে পড়ে থাকে শুধুমাত্র সুযোগের অভাবে।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুকান্ত সাহা বলেন, হাওরের মতো প্রান্তিক এলাকা থেকেও কেউ যদি নিজের মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে স্থান করে নেয়, সেটি আমাদের জন্য গর্বের। রামাচরণের মতো তরুণরা আমাদের সাংস্কৃতিক শক্তির প্রমাণ। উপজেলা প্রশাসন সবসময় চায়, এ ধরনের প্রতিভাবানদের পাশে থাকতে এবং তাদের কাজকে উৎসাহ দিতে।
হাওরের এক তরুণের গানে যখন কোটি মানুষ গলা মেলায়, তখন বোঝা যায় প্রতিভা কোনো শহর চেনে না, চেনে আত্মবিশ্বাস আর মননের উড়ান। সুব্রত দেবনাথ রামাচরণ সেই উড়ানে হাওরের গানকে পৌঁছে দিচ্ছেন জাতীয় মঞ্চে।
