আধুনিক ডেস্ক ::
গত ১২ জুন এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ১৭১ বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ‘এয়ারক্রাফট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’ (এএআইবি)-র প্রকাশিত রিপোর্ট বলছে, ওড়ার কয়েক সেকেন্ড পরেই ১২ বছরের পুরনো বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের ‘ফুয়েল-কন্ট্রোল সুইচ’ (জ্বালানি নিয়ন্ত্রক সুইচ) হঠাৎ হয়ে ‘কাট-অফ’ পজিশনে চলে যায় বা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। যে কারণে বিমানের ইঞ্জিনে জ্বালানি একেবারেই পৌঁছেনি। সাধারণত বিমান ল্যান্ড করা বা অবতরণের পরেই ‘কাট-অফ’ পজিশনে এ সুইচ করা হয়। ককপিটের ভয়েস রেকর্ডিং-এ শোনা গেছে, একজন পাইলট অন্যজনকে জিজ্ঞাসা করছেন কেনো তিনি ওই সুইচ “কাট-অফ করেছেন”। উত্তরে অপর পাইলট জানান, তিনি করেননি।
ভারতের আহমেদাবাদে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান দুর্ঘটনার একটি প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে শনিবার (১২ জুলাই) । প্রকাশিত ১৫ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদনে কয়েকটা প্রাথমিক তথ্য উঠে এসেছে। এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট নম্বর ১৭১ আকাশে ৪০ সেকেন্ডেরও কম সময়ের জন্য উড়ানের পর আহমেদাবাদেরই একটা জনাকীর্ণ এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। উড়ান শুরু করার ঠিক পরপরই কী সমস্যা হয়ে থাকতে পারে, সে বিষয়ে জানতে ধ্বংসাবশেষ ও ককপিট রেকর্ডারে রেকর্ড হওয়া সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখেছেন তদন্তকারীরা। এয়ার ইন্ডিয়ার ওই বিমান স্বাভাবিক আবহাওয়ায় ৬২৫ ফুট উপরে উঠে ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে ‘লোকেশন ডেটা’ হারিয়ে ফেলে বলে ‘ফ্লাইটর্যাডার২৪’ থেকে জানা গিয়েছে। ভারতীয় নিয়ন্ত্রকদের পাশাপাশি এই ঘটনার তদন্তে বোয়িং, জিই, এয়ার ইন্ডিয়া, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশানাল ট্রান্সপোর্টেশন সেফটি বোর্ড (জাতীয় পরিবহন সুরক্ষা বোর্ড) এবং যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞরাও সামিল ছিলেন। প্রকাশিত তদন্ত রিপোর্ট বেশ কয়েকটা প্রশ্ন তুলেছে।
গত ১২ জুন লন্ডনগামী বিমানটি উড্ডয়নের পরপরই একটি আবাসিক এলাকায় বিধ্বস্ত হয়। এতে ২৪২ জন আরোহীর মধ্যে একজন ব্রিটিশ নাগরিক ছাড়া বাকি সবাই নিহত হন। পরদিন থেকেই ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় তদন্ত শুরু করে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকেও তদন্তকারীরা ঘটনাস্থলে আসে। সেইদিন বিমানটির প্রথম ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করা হয়। দ্বিতীয় ব্ল্যাকবক্সটি পাওয়া যায় ১৬ জুন যেখানে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়েছিলো সেখানকার ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। যদিও ঠিক কোন জায়গায় পাওয়া গেছে তা প্রকাশ করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত ব্ল্যাকবক্স থেকে পাওয়া ডেটা বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনার ইন্টারন্যাশনাল এভিয়েশন রুলসের আওতায় প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করা হলো।
এএআইবি বিমানটির দুর্ঘটনা বা বিধ্বস্ত হওয়ার বিষয়ে পনের পাতার যে প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে তাতে বিমানটি উড্ডয়নের কয়েক সেকেন্ড পর বিধ্বস্ত হওয়ার আগে যা যা ঘটেছিলো তার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিমানটি উড্ডয়নের পর ১৮০ নটস গতিতে পৌঁছে গিয়েছিলো এবং এরপরপরই এক সেকেন্ডের ব্যবধানে দুটি ইঞ্জিনেরই ফুয়েল কন্ট্রোল সুইচ ‘রান থেকে কাট অফ’ পজিশনে চলে যায়। ককপিটে পাইলটদের কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ডিং, একজন পাইলটকে জিজ্ঞেস করতে শোনা যায় যে তিনি কেন সুইচ বন্ধ করলেন। অন্য পাইলট বলেছেন তিনি এমন কিছু করেননি”।
আন্তর্জাতিক সময়ানুযায়ী ৮টা ৮ মিনিট ৫২ সেকেন্ডের সময় “১ নম্বর ইঞ্জিন এর ফুয়েল কাট অফ সুইচ আবার ‘রান’ (চালু) অবস্থায় ফিরে আসে এবং এর ৪ সেকেন্ড পর দুই নম্বর ইঞ্জিনের ফুয়েল কাটঅফ সুইচও ‘কাট অফ থেকে রান’ অবস্থায় ফিরে আসে”। কিন্তু ৮টা ৯ মিনিট ৫ সেকেন্ডে, অর্থাৎ নয় সেকেন্ডের ব্যবধানে, একজন পাইলট গ্রাউন্ডে থাকা এয়ার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের ‘মে ডে’ ‘মে ডে’ ‘মে ডে’ বলে বার্তা দেন।
প্রসঙ্গত, ‘মে ডে’ একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃত বিপদ সংকেত। সাধারণ পাইলটরা সংকটের মুখে পড়লে এয়ার ট্রাফিক কর্মকর্তাদের তিন বার এই বার্তা দিয়ে বোঝান যে বিমানটি মারাত্মক সংকটে পড়েছে ও তাদের দ্রুত সহায়তার প্রয়োজন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে যে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানগুলোর জন্য যেখান থেকে জ্বালানি নেয়া হয় সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে যা পাওয়া গেছে তা ‘সন্তোষজনক’ । এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা এর আগে বলেছিলেন যে, “বিমানটির বিধ্বস্ত হওয়ার জন্য জ্বালানি দূষণও একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। এছাড়া জ্বালানি দূষণ বা জমাট বেধে যাওয়ার কারণেও ইঞ্জিন ফেইলিওরের ঘটনা ঘটতে পারে”।
বিমানের ইঞ্জিন একটি সুনির্দিষ্ট জ্বালানি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে পরিচালিত হয়- এই সিস্টেম বা পদ্ধতির বাধাগ্রস্ত হলে এটি জ্বালানি শুন্যতার সৃষ্টি করে এবং এর ফলে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়।
এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ১৭১ এর ক্রু ও দুই পাইলট বিমান পরিচালনায় সক্ষম ছিলেন কি-না সেটি নিশ্চিত করতে নিয়মানুযায়ী যথাযথ পরীক্ষা করা হয়েছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, মুম্বাই ভিত্তিক উভয় পাইলট আহমেদাবাদে এসেছিলেন এক দিন আগে এবং তারা ‘বিশ্রামের যথাযথ সময়’ পেয়েছিলেন। ক্রু ও পাইলটদের শ্বাসনালীর পরীক্ষাও হয়েছিলো স্থানীয় সময় সকাল ৬ টা ২৫ মিনিটে এবং তাদের বিমান চালনার জন্য উপযুক্ত পাওয়া গিয়েছিলো বলে ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।
ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহন নিয়ন্ত্রক ডিরেক্টর জেনারেল অফ সিভিল অ্যাভিয়েশন বা ডিজিসিএ’র তথ্য, বিমানটির পাইলট “ক্যাপ্টেন সুমিত সাভারওয়াল একজন এলটিসি ছিলেন। তার ৮২০০ ঘণ্টা বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল। কো-পাইলটের ১১০০ ঘণ্টা বিমান চালানোর অভিজ্ঞতা ছিল।” এলটিসির অর্থ হল লাইন ট্রেনিং ক্যাপ্টেন, অর্থাৎ তিনি অন্য পাইলটদের প্রশিক্ষণ দিতেন।