মঙ্গলবার, জুলাই ১৬, ২০২৪
Google search engine
Homeশীর্ষ সংবাদওত পেতে আছে ‘স্প্রে পার্টি’, অটোরিকশায় সাবধান

ওত পেতে আছে ‘স্প্রে পার্টি’, অটোরিকশায় সাবধান

এম কে তুহিন
মিষ্টি একটি সুবাস। তারপর আর কিছু মনে নেই। যখন একটু চেতনা ফেরে তখন দেখেন সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা, দামি জিনিসপত্র গায়েব। সিলেটে প্রায় প্রতিদিনই এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছেন সিএনজি অটোরিকশাযাত্রীদের অনেকেই। ‘স্প্রে পার্টি’ খপ্পরে পড়ে দামি জিনিসপত্র খোয়ালেও প্রতিকার মিলছে না। এমন ঘটনা ঘটছেই।
সিলেট নগরীতে গণপরিবহন বলতে কিছু নেই। পথ চলতে অনেক ক্ষেত্রে সিএনজি অটোরিকশাই ভরসা নগরবাসীর। এটিকেই সুযোগ হিসেবে নিয়েছে সিএনজি অটোরিকশা চালকের একটি চক্র। দিনে কিংবা রাতে টার্গেট করা ব্যক্তিকে অটোরিকশায় তুলে নেন। যাত্রী হিসেবে থাকেন ওই চক্রেরই আরো দুই সদস্য। তারা কৌশলে ‘টার্গেট’কে বসিয়ে দেন অটোরিকশার পেছনের সিটের মাঝখানে। দুই পাশে বসেন চক্রের সেই দুই সদস্য। কিছুদুর যাওয়ার পর কখনও ‘স্প্রে’ ব্যবহার করে আবার কখনও তেল বা সুগন্ধিজাতীয় চেতনানাশক ব্যবহার ঘোরের মধ্যে ফেলেন ওই যাত্রীকে। কিছুসময় ‘বেখবর’ হয়ে যান টার্গেট করা যাত্রীটি। এই সময়ের মধ্যেই তার সাথে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নিয়ে অটোরিকশা থেকে নেমে পড়েন চক্রের এক সদস্য। কিন্তু কিছুই টের পান না ভুক্তভোগী। আরও কিছু দূর গিয়ে কোনো এক অজুহাতে যাত্রীকে নামিয়ে দিয়ে দ্রুতই সরে পড়েন অটোরিকশা চালক। তখনও ওই যাত্রীর ঘোর পুরোপুরি কাটেনি। ধীরে ধীরে যখন স্বাভাবিক হতে থাকেন, মনে পড়ে মোবাইল ফোনের কথা। পকেটে বা হ্যান্ডব্যাগে হাত দিয়ে দেখেন মোবাইল ফোন নেই, টাকা-পয়সা , জিনিসপত্রও গায়েব। তখন আর কিছুই করার থাকে না। সিএনজি অটোরিকশা তো কখনই হাওয়া হয়ে গেছে।
এমন ঘটনা নিয়মিতই ঘটছে নগরীর বন্দরবাজার-হুমায়ুন রশীদ চত্বর, পুলেরমুখ- টুকেরবাজার, আম্বরখানা- হুমায়ুন রশীদ চত্বর, আম্বরখানা-বন্দরবাজার, আম্বরখানা-টিলাগড়, আম্বরখানা-টুকেরবাজার, টিলাগড়- মেজরটিলাসহ সিএনজি অটোরিকশার বিভিন্ন রুটে। কোন কোন ক্ষেত্রে নীরবে সহ্য করছেন। কেউ কেউ অভিযোগ করেও প্রতিকার পান না। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে তারা কোনো অভিযোগ পায় না। কার কাছে বিচার দেবেন ভুক্তভোগীরা? মনের দুঃখ তাই তুলে ধরেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
দৈনিক আধুনিক কাগজের কাছে এরকমই এক অভিজ্ঞতার গল্প বললেন ভুক্তভোগী আমজাদ হাসান ফাহিম। তিনিও খপ্পরে পড়েছিলেন ‘স্প্রে পার্টি’র। সে ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি এভাবে,

আমি রাত ৮ ঘটিকার সময় বন্দর বাজার থেকে সোবহানীঘাট যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিতে উঠি। ড্রাইভারের পাশে একজন এবং গাড়ির পিছনের সিটে আরো দুই জন যাত্রী ছিলেন। ধোপাদিঘীর পার যাওয়ার পর গাড়ির ড্রাইভার বলল গাড়ির চাকায় কি একটা সমস্য হচ্ছে গাড়ি থেকে নামার জন্য। আমি নামলাম। আমার সাথে আমার ল্যাপটপ ছিল সাথে আরো দুটি ব্যাগ। ড্রাইভার বলল ব্যাগগুলো পিছনে রেখে গাড়িতে ধাক্ষা দেওয়ার জন্য। গাড়িতে ধাক্ষা দিয়ে যখন গাড়িতে উঠছিলাম তখন আমার পাশেরজন বলল, ভাই আপনি মাঝখানে চলে যান, আমার মাঝখানে বসতে সমস্যা হচ্ছে। আমার বমির ভাব হচ্ছে। পরে গাড়িটি ছাড়ার পর সোবহানীঘাট পয়েন্ট পার হওয়ার সাথে সাথে আমার পাশে থাকা ব্যক্তি বলল, গাড়ি থেকে পোড়া পোড়া গন্ধ বের হচ্ছে বলেই একটা ‘প্রে’ বের করে মারতে থাকে। সাথে সাথে মনে হচ্ছিল আমার জানি কি হয়ে যাচ্ছে। আমি ড্রাইভারকে বললাম গাড়িটি থামানোর জন্যে কিন্তু ড্রাইভার গাড়িটি থামাচ্ছিলেন না। পরে আমি লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু সামনে বসা ব্যক্তি আমি যাতে না নামতে পারি তার জন্যে হাত দিয়ে আমাকে ধরে রাখার চেষ্টা করে। আমি জোড় করে নামার সময় আমার পাশে থাকা ব্যাক্তি আমার মোবাইল ছিনিয়ে নেয়। পরে তারা চলে যায়।
আরেক ভুক্তভোগী আদৃতা পিংকি বলেন, আমি বাসা থেকে বের হয়ে বন্দর যাওয়ার জন্য সিএনজিতে উঠি। সিএনজিতে একজন বোরকা পড়া আন্টি ছিলেন। আম্বরখানা ক্রস করার পর হঠাৎ আন্টি উনার হিজাবটা খুলে মাথায় তেল দেওয়া শুরু করলেন। উনার তেল দেওয়া দেখে আমি অবাক হই। কারণ উনি যেহেতু পর্দা করেন তো পর্দা খুলে কেন মাথায় তেল দিতে যাবেন। তেলের সুগন্ধিটা এত কড়া যা আমার নাকে আসার সাথে সাথে আমার ঘুম চলে আসছে। তখন আমার হঠাৎ মনে হল আমি যদি ঘুমিয়ে যাই আমার ফোনটা পড়ে যায়। আমার শরীর খারাপ করায় আমি ড্রাইভারকে বলি আমাকে নামিয়ে দেওয়ার জন্য কিন্তু। আমার একটাই খারাপ লাগতেছিল যে আমি জুরে বলতেও পারতেছিলাম না আমাকে নামিয়ে দেওয়ার জন্য। ড্রাইভার কোন ‘রেসপন্স’ করতেছিলেন না। চৌহাট্টা যাওয়ার পর আমি জ্যামে আটকা পড়া অবস্থায় নেমে যাই। ড্রাইভার হঠাৎ করে আমার সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করেন। আমি কেন বন্দর বলে চৌহাট্টা নেমে যাচ্ছি। আমি টাকা দিছি উনি নেয়নি। পওর াইম পানি ক্রয় করে মাথায় ও মুখের মধ্যে দেই। দিয়ে বাসায় চলে আসি। বাসায় আসার পরও আমার মাথা ভার ছিলো। শরীরটা অনেক খারাপ ছিলো।
আম্বরখানা-সালুটিকর উপ-পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম বলেন, গত দুই মাস থেকে শহরে ‘স্প্রে পার্টি’ নামে একটি চক্র সিএনজি অটোরিকশাকে ব্যবহার করে যাত্রীদের সাথে থাকা টাকাপয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে। এটা আগে এই শহরে ছিলোনা। আমরা এ বিষয়ে সজাগ ইছ। আমরা যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য যা যা করার তা করব।
আম্বরখানা-সালুটিকর উপ-পরিষদের সভাপতি আব্দুল মন্নান বলেন, এ বিষয়ে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে দফায় দফায় মিটিং করেছি। আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের বলে দিয়েছি অপরিচিত কাউকে এই রুটে পেলে তার নেতার সাথে কথা বলে তার পরিচয় শনাক্ত করে তাকে ছেঢ়ে দেওয়া। আবার আমার শ্রমিক যদি কেউ জড়িত হয় একাজে আমরা তাকে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে সকলকে সহযোগীতা করব।
সিলেট মহানগরের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (মিডিয়া) সাইফুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরাও দেখেছিলাম এবং এরকম ‘প্রে’ প্রয়োগ করার সংবাদগুলে সিলেটের সাধারণ মানুষ ফেসবুক ভাইরাল কার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি। পরবর্তীতে আমরা আমাদের গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছি। যাতে এ ধরনের কার্যক্রম যারা করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। যদি কোন যাত্রী সিএনজিতে উঠার পর যাত্রী বা কারো আচরণ সন্দেহজন মনে হয় অবশ্যই আমদের ট্রাফিকপুলিশ সদস্যদের নহায়তা যেন গ্রহণ করেন। আমরা অনেককেই বলেছি আপনার কোন সমস্যায় থানায় যান, পুলিশের কাছে যান, অথিযোগ করুন, সময়টা ও স্থানটা আমাদের কাছে বলুন। হেহেতু আমরা আইপি ক্যামেরার মাধ্যমে সিলেট নগরে সানুষের গতিবিধি বা গাড়ির নাম্বারটা সনাক্ত করতে পারি। যদি আমরা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাই আমরা ব্যবস্থা নিতে পারব। আমরা জানিনা আসলে এই চক্রে কতজন আছে। প্রকৃতঅর্থে তাদেরকে আইনের আওয়ায় এনে কারা আছে এটা শনাক্ত করতে পারব। এখন পর্যন্ত আমরা কোন অভিযোন পাইনি। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারব।

প্রাসঙ্গিক সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

জনপ্রিয়

Recent Comments