মঙ্গলবার, মার্চ ৫, ২০২৪
Google search engine
Homeসিলেট‘বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার্থীদের ৭৪ শতাংশই বিষণ্ণতায় ভুগছেন’

‘বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার্থীদের ৭৪ শতাংশই বিষণ্ণতায় ভুগছেন’

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিচ্ছুদের মধ্যে ৭৪ শতাংশ পরীক্ষার্থীই মানসিক বিষণ্ণতায় বা হতাশায় ভুগছেন; এর মধ্যে ২২ শতাংশই মারাত্মক পর্যায়ের। এ ছাড়া উচ্চ মাধ্যমিকে জিপিই-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ এমন ‘বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার্থীরাও’ বিষণ্ণতায় ভুগছেন।

গত ৩০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক গবেষণা জার্নাল প্লস ওয়ানের ক্যাটাগরি কিউ-১ এ প্রকাশিত বাংলাদেশি একদল গবেষকদের এক গবেষণাপত্রে এমন তথ্য উঠে এসেছে। এ সমস্যা সমাধানে গবেষকরা কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরেছেন তাদের অনুসন্ধানে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিনের তত্ত্বাবধানে ৬ জন গবেষক গবেষণাটি সম্পন্ন করেছেন।

‘বাংলাদেশে স্নাতক ভর্তি প্রার্থীদের মধ্যে বিষণ্ণতার প্রাদুর্ভাব এবং কারণসমূহ’ শিরোনামে গবেষণাটি কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। গবেষণা বাজেট সংকটসহ বিভিন্ন কারণে এটি বিলম্বিত হয়েছে; তবে প্রায় দুই বছর কাজ শেষে গত মাসে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে বলে জানান গবেষকরা।

বাংলাদেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের উচ্চমাধ্যমিকে উত্তীর্ণ প্রায় ৫ হাজার বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তিচ্ছুদের মতামত নিয়ে এই গবেষণায় আউটপুট তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষকদলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন- শাবির পরিসংখ্যান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মো. আবু বকর সিদ্দিক, মো. নাফিউল হাসান ও আল মাহমুদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী মুনমুন সরকার, যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক হেলথ বিভাগের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান মিলাদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশবিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের শিক্ষার্থী আখের আলী, চট্টগ্রাম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জুবায়ের আহমেদ।

গবেষণার আউটপুট কি জানতে চাইলে গবেষক দলের তত্ত্বাবধায়ক অধ্যাপক ড. জামাল উদ্দিন বলেন, দেশের ৭৪ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার্থী বিভিন্ন পর্যায়ের বিষণ্ণতায় ভুগছেন। এর মধ্যে মাঝারি বিষণ্ণতায় ২৬ শতাংশ, অত্যাধিক বিষণ্ণতায় ২৬ শতাংশ এবং ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী মারাত্মক পর্যায়ের বিষণ্ণতায় ভুগছেন।’’

‘ডিপ্রেশন বা বিষণ্ণতা কি’ এ বিষয়ে অধ্যাপক জামাল উদ্দিন বলেন, বিষণ্ণতা একটি প্রচলিত ও মারাত্মক মানসিক অসুস্থতা; যা আপনার অনুভূতি, চিন্তা এবং আচরণকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। এবং এটি আত্মহত্যার দিকে টেনে নিয়ে যায়।’’

বিষণ্ণতা পরিমাপের আন্তর্জাতিক একটি মাত্রা হচ্ছে `পেশেন্ট হেলথ কোয়েশ্চনিয়ার’- সংক্ষেপে ‘পিএইচকিও নাইন’ বলে থাকে; তা দিয়ে পরিমাপ করে গবেষকরা গবেষণার মাত্রা নির্ধারণ করেছেন।

বিষণ্ণতা বাড়ার কিংবা কমার- এই উভয়পক্ষে কতগুলো প্রভাবককে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।

বিষণ্ণতা বাড়ার পেছনে প্রভাবক বা কারণ হিসেবে রয়েছে- লিঙ্গ (ছেলে এবং মেয়ে), ব্ল্যাকমেইলের শিকার, পারিবারিক সমস্যা, গুরুতর অসুস্থতা, কোভিড আক্রান্ত প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফল ও মানসিক সমস্যা।

অন্যদিকে, বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশন কমার ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে- ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস, শরীরচর্চা, পড়াশুনার সময় ও ধর্মচর্চা।

গবেষকরা বলছেন, পারিবারিক আয় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বিষণ্ণতার প্রভাবক বা কারণ হিসেবে চিহ্নিত হলেও এদের প্রভাব খুব জোরালো নয়।

এ ছাড়া পরীক্ষার্থীদের ‘বিষণ্ণতার সঙ্গে ধুমপানের অভ্যাস, বৈবাহিক অবস্থা, প্রেমের সম্পর্ক ও ধর্মবিশ্বাসের’ কোনো সম্পর্ক নেই’ বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে বলে জানান গবেষক অধ্যাপক জামাল।

গবেষক দল নেতা মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ছেলেদের তুলনায় মেয়ে শিক্ষার্থীদের ‘অত্যাধিক বিষণ্ণতায় ভোগার ঝোঁক’ প্রায় দ্বিগুণ। খুব সম্প্রতি কোনোপ্রকার ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়া এবং পারিবারিক সমস্যায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীদের অত্যাধিক বিষণ্ণতায় ভোগার ঝোঁক ২ থেকে ৩ গুণ।

অপরদিকে, যাদের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ আছে তাদের মাঝে বিষণ্ণতার হার অধিক এবং ঝোঁক প্রায় দেড়গুণ। তবে যাদের জিপিই-৫ আছে তাদের কেন বিষণ্ণতার মাত্রা বেশি; এটি আরও গবেষণা করে দেখা যেতে পারে বলে জানান মো. আবু বকর সিদ্দিক।

এদিকে, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি সচেতন এবং নিয়মিত শরীরচর্চাকারী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিষণ্ণতার হার তুলনামূলক কম এবং আক্রান্ত হওয়ার ঝোঁক যথাক্রমে এক দশমিক চার এবং ২ গুণ কম।

বিষণ্ণতা কিভাবে কমানো যায়- জানতে চাইলে অধ্যাপক জামাল ও মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য সৎ সঙ্গ এবং উত্তম পারিবারিক পরিবেশ ও বোঝাপড়ার কোনো বিকল্প নেই। সেইসাথে শরীরচর্চা এবং ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি সচেতনতাও গুরম্নত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিক্ষার্থীদের শুধু দৈহিক সুস্বাস্থ্যই নয়; মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করাও অপরিহার্য।’

শুধু ভালো একাডেমিক ফলাফল নয়, দৈহিক ও মানসিকভাবে বলিষ্ঠ প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রের এগিয়ে আসা প্রয়োজন বলে জানান গবেষকরা।

প্রাসঙ্গিক সংবাদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

জনপ্রিয়

Recent Comments